শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠাতার সদস্যের কবর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১৪ ডিসেম্বর ২০১৫, ০২:০৭আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫, ০২:১৪
image

১৪ ডিসেম্বর সোমবার প্রত্যুষেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ফুলেল শ্রদ্ধা অর্পণ করবে সবাই। বুদ্ধিজীবী শহীদ মিনারের পাশেই মিরপুর-অঞ্চল-৪ এর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থান। আর এই গোরস্থানেই আছে একাত্তরে পাকিস্তানি ঘাতকবাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আখতার ফারুকের কবর! তার কবর থেকে মাত্র দুশ গজ দূরেই বুদ্ধিজীবী শহীদ মিনার। সোমবার যেখানে পড়বে লাখো মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলী।

গোরস্থান কর্তৃপক্ষ জানাল, পাকিস্তানের হয়ে কাজ করা আখতার ফারুকের কবরে তার পরিবারের কেউ খুব একটা আসে না। ২৫ হাজার টাকায় কেনা স্থায়ী কবরটির চারপাশে বাঁশের বেড়া থাকলেও তিন দিক থেকে অনেকটা ভেঙে গেছে। আখতার ফারুক ২০০৬ সালের ২৯ এপ্রিল পান্থপথ জামে মসজিদে মারা যান। সর্বশেষ তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির ছিলেন (ভেঙে যাওয়ার আগে)। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ‘বুদ্ধিজীবী, ইসলামী চিন্তাবিদ’ হিসেবেই পরিচিত। বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড তার লেখা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

‘একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়’ শীর্ষক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা গ্রন্থের ৮০ পৃষ্ঠায় বলা আছে, ‘খেলাফত আন্দোলনের বর্তমান ও সাবেক কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রায় সকলেই স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছেন। এদের মধ্যে কুখ্যাত দুজন হচ্ছেন তোয়াহা বিন হাবিব এবং আখতার ফারুক। দুজনই কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।’

বর্তমানে খেলাফত আন্দোলন দলটির মহাসচিব হিসেবে আছেন মাওলানা জাফরুল্লাহ খান। তার বিরুদ্ধেও একাত্তরে বাংলাদেশ বিরোধিতার অভিযোগ আছে। তবে শীর্ষ একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানায়, এই অভিযোগ ওঠার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাটির সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলছেন মাওলানা জাফরুল্লাহ খান। এ বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।

ওই গ্রন্থের তথ্যমতে, ‘আখতার ফারুক স্বাধীনতার সময় ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর শুরার সদস্য এবং দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার সম্পাদক।’

পরের প্যারায় আখতার ফারুক সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে, “সে সময় দৈনিক সংগ্রামে গণহত্যার সমর্থনে তার লেখা অসংখ্য সম্পাদকীয় এবং নিবন্ধের মধ্যে একটি প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখিত হতে পারে। হানাদার এবং দালালদের ‘পাকিস্তান ও ইসলামবিরোধী চর হিসেবে ঢালাও নির্মূল অভিযানের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে ইত্তেফাকে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন ‘ঠক বাছতে গাঁ উজাড়’ নামে একটি নিবন্ধ লেখেন। এর প্রতুত্তরে আখতার ফারুক ১৬ সেপ্টেম্বর সংগ্রামের প্রথম পাতায় ‘অতএব ঠগ বাছিও না’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ নিবন্ধ লিখে স্বাধীনতামনা বুদ্ধিজীবীদের নির্মূলের জন্য খোলাখুলি আহ্বান জানান।”

সূত্রমতে, ১৯৬৯ সালে সংগ্রাম পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন আখতার ফারুক। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন ১৯৮১ সালে। দলটির প্রচার সম্পাদক এবং দলত্যাগ করে পরে অবিভক্ত খেলাফত মজলিসে যোগ দেন তিনি।

বর্তমানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিস দুটি পৃথক নামে যার যার রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একটির আমির সিলেটের বিতর্কিত আলেম মাওলানা হাবিবুর রহমান বুলবুলি হুজুর অন্যটির আমির মালেক মন্ত্রিসভার মন্ত্রী অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক। এই অংশের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের। যিনি ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি। পরে শিবির ভেঙে যুবশিবির নামে আরেকটি সংগঠন করেন তিনি।

মজলিসের অন্য অংশটির মহাসচিব মুফতি মাহফুজুল হক। তিনি শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের তৃতীয় ছেলে।  প্রয়াত আজিজুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ১৯৮৭ সালের জুনে মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের প্রকাশিত ‘একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়’ বইটিতে। ১৯৭১ সালের ৩ জুন মুহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জির নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলনের নেতারা একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। সে বিবৃতিটি ছিল ‘পাকিস্তানের বিশেষতঃ পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামপ্রিয় লোকদের সামরিক ট্রেনিং দানের ব্যবস্থা করার জন্য’ সামরিক সরকারের প্রতি আবেদন। ওই বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী আলেমদের মধ্যে ছিলেন আল্লামা আজিজুল হক। তিনি ওই সময় লালবাগ জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার হাদিসের শিক্ষক ছিলেন।

 

এটা লজ্জার এটা চুকে গেছে

আখতার ফারুকের কবর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে হওয়াটাকে লজ্জার ও অপমানজনক বলেছেন নারী ও মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, শুধু একজন নয়, হয়তো আরও অনেকেরই কবর মিলবে। এটা দুঃখজনক। যারা সরাসরি দেশের মুক্তির সংগ্রামের বিরোধিতা করেছেন, তারা এমন কিছু মানুষের পাশে কবরস্থ হয়েছেন, যারা দেশের জন্য জান দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। এই যে সোমবার বুদ্ধিজীবী দিবসে মানুষ শ্রদ্ধার্পণ করবে, আর পাশে থাকবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীর কবর, এটা কষ্টের। এটা হতে দেওয়া যাবে না। একটা ব্যবস্থা করতে হবে। 

তবে বিষয়টি চুকে গেছে বলেই মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসির মামুন। তার ভাষ্য, আমরা অনেক আগেই প্রস্তাব করেছিলাম যে, স্বাধীনতাবিরোধীদের জন্য আলাদা জায়গা করা হোক। আমরা বাধা দিলেও ঠিকই তো সাকা চৌধুরী, কাদের মোল্লাদের দাফন হয়। দেখা যাবে, এরপর তাদের পাশে অন্য কারও লাশ দাফন হবে। তো এটা নিয়ে কী করার আছে। তবে ক্ষতিপূরণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।

এ নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপিপন্থী এক অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এটা নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। তবে বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে না হয়ে সাধারণ কোথাও হতে পারত। তিনি এও বলেন, সরকার তো জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের কবর তুলতে চায়। এখন বুদ্ধিজীবী গোরস্থান থেকে শান্তি কমিটির সদস্যকে কি তুলে দেবে?

/এফএ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কর্মকর্তাদের কলম বিরতির নির্দেশনা নেই: ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি
কর্মকর্তাদের কলম বিরতির নির্দেশনা নেই: ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি
উচ্চ ক্ষমতার কার্বন ফাইবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু চীনে
উচ্চ ক্ষমতার কার্বন ফাইবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু চীনে
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
অলসতা মনে হলেও যে অভ্যাসগুলো হতে পারে বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ
হঠাৎ রেমিট্যান্স আসা কমে গেলো
হঠাৎ রেমিট্যান্স আসা কমে গেলো
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী