‘মৃত্যু নিশ্চিত জেনে চোখের সামনে মায়ের ‍মুখটা ভেসে উঠেছিল’

উদিসা ইসলাম।।
১৪ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৬:১৯আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৬:১৯
image

 

IMG_9938

সৈয়দ আবুল বারক আলভী ১৯৪৯ সালে পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্মস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সে চাকরি করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে প্রশিক্ষণ নিয়ে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। একপর্যায়ে ঢাকায় হামলার প্রস্তুতি নিতে অস্ত্র গোলাবারুদসহ ভারত থেকে ফিরলে আলতাফ মাহমুদের বাসা থেকে শহীদ আলতাফ মাহমুদ ও তার আত্মীয়সহ তিনি পাকিস্তানি আর্মির হাতে আটক হন। এরপর চলে সীমাহীন নির্যাতন। নির্যাতন কেন্দ্রে শেষবারের মতো দেখতে পান সহযোদ্ধা বাকের, রুমিসহ চেনা আরও অনেক মুখের যারা আর ফিরে আসেনি। নির্যাতনে তার হাত দুটো থেতলে দেওয়া হয়েছিল, সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন। নাম না মেলার কারণে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলে আবারও যুদ্ধে যান। তবে আর ঢাকায় ঢোকা হয়নি কারণ তার চেহারা চেনা হয়ে গেছে। বাকী সময় বিভিন্ন সম্মুখ সমরে ছবি তোলার কাজ করেছেন। প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগে ও পরে একাধিকবার ঢাকায় আসা যাওয়ার সুবাদে পথে পরিচিত হয়েছেন অনেক মানুষের সঙ্গে যাদের চেহারা আজও চোখে ভাসে তাঁর। তিনি বিশ্বাস করেন, সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়ার বাইরে বাংলাদেশের সর্বসাধারণ মুক্তিযুদ্ধকে সহায়তা দিয়েই এগিয়ে নিয়ে গেছেন। বর্তমানে তিনি চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সংবিধান অলংকরণে অন্যদের সঙ্গে কাজ করেছেন সেই ঘরে বসেই যেখানে তাকে কয়েক দফায় অমানবিক নির্যাতন করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। বুদ্ধিজীবী দিবসের পূর্বমুহূর্তে তার কাজের জায়গায় বসে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে।

-একাত্তরেকোথায়ছিলেন? কীকরতেন?

আমি তখন সরকারি চাকরি করছি ফিল্মস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সে। যদিও আমি সরকারি চাকরি করছি, কিন্তু চারুকলায় পড়া অবস্থায় তো সবসময়ই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলাম। অফিসেও সবার সঙ্গে করণীয় নিয়ে আলাপ হতো। বিভিন্ন জায়গা থেকে সেসময় নানা খবর আসছে- নানা জায়গায় পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, নির্বিচারে খুন হচ্ছে। আমরা অস্থির হয়ে ছিলাম করণীয় নির্ধারণ।

-যুদ্ধেকীভাবে, কোনপথেগেলেন?

তখনও যুদ্ধ ঠিকমতো শুরু হয়নি। সবে কথাবার্তা, প্রস্তুতি চলছে। আমরাও ঠিক জানি না কোথায় যেতে হবে। পরে আমি, আহরার ও রূপু ছিল। রূপু হচ্ছে শবনম মোস্তারির মামা। কেবল জানতে পেরেছিলাম সোনামুড়ায় ক্যাম্প তৈরি হবে, মুক্তিযুদ্ধের আয়োজন চলছে। বুঝলাম যে আগরতলায় গেলে অনেককে হয়তো পাওয়া যাবে। আমরা গুলিস্তান থেকে স্কুটার নিয়ে রওনা হই। চান্দিনা পেরিয়ে একটা জায়গায় নেমে আমরা একটা রিকশা নিলাম। রিকশাওয়ালাই আমাদের পথ দেখালেন। এরপর জমিনের আইল, পাহাড় ডিঙিয়ে সোনামুড়ায় পৌঁছলাম। ওখানে আর্মির চিকিৎসক ক্যাপ্টেন আখতার একটা বাংলোয় ছিলেন। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে আমরা আগরতলায় চলে গেলাম।

অবাক করার বিষয়, আবার যখন ফিরি তখন ওই রিক্সাচালকই আমাদের চিনে ফেলে তার বাসায় পেটপুরে খিচুড়ি, মুরগি দিয়ে খাইয়েছেন। সেসময় মানুষের মন কেমন জানি হয়ে গিয়েছিল। তারা সাহায্য করেই মুক্তিযুদ্ধকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

12309291_1678608202378825_1606394642_n

-তারপর?

তখন আমরা মেলাঘরে। দুই নম্বর সেক্টরে। মাঝে মাঝে দেশে ঢুকেছি আবার ফিরে গেছি। আগস্ট মাসে আমরা চারজন ঢুকলাম দেশে- আমি, ফতেহ আলী, বাকের ও কমল। আমরা একেকজন এলএমজি, বিস্ফোরক দ্রব্য, গ্রেনেডসহ এক মন ওজনের অস্ত্র বহন করেছি। কীভাবে করেছি বলতে পারব না।

-তারপরপাকিস্তানিআর্মিদেরহাতেগ্রেফতারহলেনকখন?

আমরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড্ডা দিয়ে ঢুকলাম। সেখানে তখন কিছুদূর টিলা, তারপর পানি, আবার টিলা। সেখানে বাকেরের আত্মীয়ের বাসায় সব রাখা হলো সুযোগ মতো জায়গা মতো পৌঁছে দেওয়া হবে এই ভেবে। এমন সময় আমাকে খবর দিলেন আলতাফ মাহমুদ। তিনি তখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ওখানে শহীদবাগে থাকেন। সেদিন সেখানে গিয়ে আলাপ করতে করতে রাত হয়ে যাওয়ায় সেখানেই থেকে যেতে হয়েছিল। যদিও আমার থাকার কথা ছিল ফতেহ আলীদের বাসায় মানে বিচিত্রার শাহাদত চৌধুরীদের বাসায়। রাতে জায়গা মতো না ফিরলে সেখানকার মানুষেরাও দুশ্চিন্তা করতো। সবমিলিয়ে ঘুম হলো না। ভোররাতের দিকে বুটের আওয়াজ। সেই ভোরে আমাদের সবাইকে ধরে নিয়ে গেল।

-ওরাআপনাকেচিনতেপেরেছিল?

ওদের কাছে আমার নামে খবর ছিল সেটা পরে বুঝেছি। কিন্তু চিনে ধরে নিয়ে গেছে এমন না। সবাইকেই মার্শাল ল কোর্টে নিয়ে যাওয়া হলো। এখন যেটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সেটা তখন অ্যাসেম্বলি ছিল। তার পাশে সংসদ সদস্যদের থাকার কোয়ার্টারগুলোই ছিল মার্শাল ল কোয়ার্টার। আমাদের একটাতে নিয়ে যাওয়া হলো। গাড়িতে ওঠানোর পর থেকেই চলতে থাকলো বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত, বুট জুতার লাথি। একঘরে সবাইকে রাখা হলো। আরেক ঘরে নিয়ে চলল নির্যাতন।

পরের দফায় আমার সামনে এসে এক সেনা জানতে চাইলো আমাদের ভেতর আলভী কে? এবার আমি ঘাবড়ে গেলাম। সেসময় আলতাফ ভাইকে নির্যাতন করছে শোনা যাচ্ছে। আমি উত্তর না দিলে সবার ওপর নির্যাতন চলবে ভেবে বললাম, আমিই আলভী। তারপর চলতে থাকলো অমানুষিক নির্যাতন। ধরেন মোটা বেত দিয়ে পেটাচ্ছে। আমার হাতের, গায়ের চামড়া ফেটে গেছে। হাতের আঙুলগুলো ফেটে গেছে। আমাকে বারবার মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে নানা কথা জিজ্ঞেস করছে। আমি বারবার অস্বীকারই করে যাচ্ছি। কিন্তু এক পর্যায়ে দেখলাম আমাকে জড়িয়ে তারা যা যা তথ্য দিচ্ছে সব ঠিক- কার সঙ্গে ঢাকায় ঢুকেছি, সঙ্গে কি কি অস্ত্র ছিল, সেটা কোথায় রাখা হয়েছে সব ঠিক। আমার হিসেব মিলছিল না। খানিক পরে তারা একজনকে নিয়ে আসল। সে আমার বন্ধু বাকের। তার সারা শরীর রক্তাক্ত। তার কাছে জিজ্ঞেস করল আমি আলভী কিনা। বাকের মাথা নেড়ে জানালো আমিই আলভী। বাকেরের সেই করুন চোখ আমার আজও মনে আছে। কিন্তু ও আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সিরিয়াস ছিল। গলায় পটাশিয়াম সায়ানায়েড নিয়ে ঘুরতো। ধরা পড়লেই আত্মহত্যা করবে। কিন্তু পারেনি। আর নির্যাতন সহ্য করাও সহজ ছিল না।

-এইঅত্যাচারথেকেছাড়াপেলেনকিভাবে?

ভীষণভাবে আহত আমরা সবাই। সে অবস্থায় অনেক রাতে আমাদের রমনা থানায় নেওয়া হলো। নাম লিস্ট করার সময় আমাকে নাম জিজ্ঞেস করা হলে আমি আলভী অংশটা বাদ দিয়ে বললাম সৈয়দ আবুল বারক। পরদিন সকালে আমাদের আবার মার্শাল ল কোর্টে নিয়ে যাওয়া হলো। তবে ভিন্ন কোয়ার্টারে যেখানে আগের দিনের নির্যাতনকারীরা কেউ ছিল না। তারা একে একে সবাইকে নাম ধরে ডেকে নিয়ে গেল, আমাকে ডাকা হল না। না ডাকাতে আমি নিশ্চিত হলাম যে আমার রিপোর্ট নেই। যে সিপাহি নাম ধরে ডাকছিল আমি তাকে বললাম যে, আমাকেও তো উনাদের সঙ্গে ধরা হয়েছিল, কিন্তু আমাকে ডাকা হচ্ছে না কেন? জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী? বললাম, সৈয়দ আবুল বারক। আবার জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন চলল। আমার হাত দুটো ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল। সারা গা ফেটে রক্তাক্ত, বীভৎস। অফিসার বলল- আমার মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের খবর যেন তাদের দিই। আমি তাদের কাটানোর জন্য বললাম, আমিতো যুদ্ধে যাইনি, কারোর কথা জানিই না।

তখন বুঝছি মৃত্যু নিশ্চিত। অত্যাচার শরীর সহ্য করে নিয়েছে। মারছে, পড়ে যাচ্ছি, তুলে আবার মারছে, কোনও অনুভূতি নেই। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে কেবল মায়ের মুখটাই মনে পড়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই তারা এমন ভাবছে যখন, তখনই আগের দিন নির্যাতনকারী সেই সুবেদার মেজর এসে পেছনে দাঁড়াল যে জানতো আমার নাম আলভী। তবে তিনি কোনও কথা বলেননি। ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ এলে তিনিই আমাকে গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ভালো চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

১৭ মার্চ শহীদ মিনার থেকে শুরু হওয়া চারুশিল্পী সংগ্রাম পরিষদের পোস্টার, ব্যানারসহ

-তারপরকোথায়গেলেন?

আমি এয়ারপোর্ট রোডে উঠে এলাম। একটা গাড়ি পাশে এসে দাঁড়িয়ে উঠতে বলল। দেখলাম নিমা রহমানের বাবা। তার বাসা থেকে কিছুদিন আগে আমি শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলাম ভারতে। নিমার বড় ভাই রানা হচ্ছে আমাদের বন্ধু। আমি তাকে বললাম আমাকে যেন আলতাফ মাহমুদের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।

-এরপরআবারযুদ্ধক্ষেত্রেকবেগেলেন?

আমি এক মাস বন্ধুদের বাসায় থাকলাম।তারপর আমি আবার মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলাম। সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরীও তখন ওখানে। আমাকে আর এপারে পাঠানো হয়নি। কারণ একবার ধরা পড়ে গেছি, সবাই চিনে গেছে। তখন আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো যুদ্ধের ফ্রন্ট সাইডে থেকে ছবি তোলার। বিজয় লাভের পর যখন বাংলাদেশের সংবিধান অলংকণের কাজ শুরু হয় তখন সেই নির্যাতনের ঘরে বসেই অন্যদের সঙ্গে আমি সেই কাজটি করেছি। তখনও আমি প্রতিটি দৃশ্য অনুভব করছিলাম, আজও যেমন করি।

/এএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বাবা-মেয়েসহ ইজিবাইকের ৩ যাত্রী নিহত
বাবা-মেয়েসহ ইজিবাইকের ৩ যাত্রী নিহত
‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করবে’
‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করবে’
নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানের শতবর্ষ পালনের আহ্বান ১৪ সাংস্কৃতিক সংগঠনের
নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানের শতবর্ষ পালনের আহ্বান ১৪ সাংস্কৃতিক সংগঠনের
মদ্যপ স্বামীকে পিটিয়ে হত্যার পর থানায় গিয়ে স্ত্রীর আত্মসমর্পণ
মদ্যপ স্বামীকে পিটিয়ে হত্যার পর থানায় গিয়ে স্ত্রীর আত্মসমর্পণ
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ