‘বিস্ফোরণে ১০ মাইল দূরেও ভবন ধসে পড়েছে, আমরা ছিলাম মাত্র আড়াইশ’ মিটারের মধ্যে’

হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
২৫ অক্টোবর ২০২০, ২২:১২আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১৬:২৩

গত ৪ আগস্ট লেবাননের বৈরুত বন্দরে রাসায়নিক গুদামে আগুন লেগে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এসময় মাত্র আড়াইশ ফুট দূরে ছিল জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’।

‘এ বছরের ৪ আগস্ট। তখন বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৪টা কী ৫টা। আমাদের জাহাজ থেকে কিছু দূরে আমি হঠাৎ করে একটা আগুন দেখতে পাই। একটু আগে জাহাজ জেটিতে ভিড়েছে। তাই আগুন দেখে জাহাজে থাকা একটা সাইকেলে চেপে সেখানে কী ঘটেছে দেখতে যাই। এটা কিসের আগুন, এই আগুনে আমাদের জাহাজের কোনও ক্ষতি হবে কিনা এসব বিষয় খতিয়ে দেখতেই  যাই। তবে সুবিধার মনে হচ্ছিল না। দেখে ফিরে আসতে আসতেই আগুনের তেজ বাড়তে থাকে। জাহাজে পৌঁছাতেও পারিনি, তার আগেই হঠাৎ ভয়াবহ বিস্ফোরণ! কিচ্ছু বোঝাতে পারবো না সে বিস্ফোরণটা কেমন! শুধু বুঝতে পারলাম আমি উড়ে যাচ্ছি। সাইকেল কোথায় গেছে আমি জানি না। শুধু মনে হচ্ছিল, এটি আমার জীবনের শেষ দিন।’

দেশে ফেরার পর সেদিনের ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘বিজয়’ এর অধিনায়ক কমডোর জয়নুল আবেদিন।

গত ৪ আগস্ট লেবাননের বৈরুত বন্দরে রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণের সময় এর খুব কাছেই ছিল জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’। পরপর দুইবার ঘটা ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গিয়েছিল ১৫০ কিলোমিটার দূরের সাইপ্রাসেও। এই শব্দে ধসে পড়ে শহরের অনেক বাড়ি-ঘর, প্রাণহানি ঘটে শতাধিক মানুষের। অথচ এর আড়াইশ থেকে তিনশ মিটারের মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ বিজয়ে থাকা  নৌবাহিনীর সদস্যরা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান সেদিন। আড়াই মাস পর দেশে ফিরে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে সেই ঘটনারই বর্ণনা দিয়েছেন কমডোর জয়নুল আবেদিন, লেবাননে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যাওয়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘বিজয়’ এর অধিনায়ক তিনি।

গত ৪ আগস্ট বৈরুত বন্দরের ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় জাহাজে থাকা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২২ থেকে ২৫ জন সদস্য আহত হন। জয়নুল আবেদিনও আহতদের একজন।

ঘটনার বর্ণনায় বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সময় বিকেল সোয়া ৬টার দিকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের পর চারদিক অন্ধকার। কিছু দেখা যাচ্ছে না। ধুলাবালি এবং গরম ধোঁয়ার মতো আসছে। এরপর যখন সবকিছু থেমে গেলো, তখন উঠে আমি দৌড় দিলাম জাহাজের দিকে। এসে দেখি আমাদের কয়েকজন যারা আহত হয়েছেন, তারা পড়ে রয়েছেন। আমাদের জাহাজের ওপরের অংশের কিছুই ছিল না। সবকিছু ভেঙেচুরে উল্টাপাল্টা হয়ে আছে। আসলে তখন এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যা আমি আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না। আমরা হিরোশিমায় বিস্ফোরণের কথা বইতে পড়েছি। কিন্তু বাস্তবে দেখিনি, এই বিস্ফোরণের কথা মনে পড়লে আমার মনে হয় হিরোশিমার মতোই একটি বিস্ফোরণ হয়েছে। বিস্ফোরণের জায়গা থেকে কয়েক মাইল একেবারে কিছুই নেই। সেখানে আমরা যে কিভাবে বেঁচেছিলাম চিন্তারই বাইরে।’

নৌবাহিনীর জাহাজ ‘বিজয়’। (যাওয়ার সময়ের ছবি)

জয়নুল আবেদিন বলেন,‘বিস্ফোরণে চারদিকে একটি স্থাপনাও ছিল না। ১০ মাইল দূরেও ভবন ধসে পড়েছে। ১৫০ কিলোমিটার দূরে সাইপ্রাস, সেখানেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। অথচ আমরা বিস্ফোরণ যেখানে ঘটেছে তার থেকে মাত্র আড়াইশ থেকে তিনশ মিটার দূরে ছিলাম। আমাদের বিজয় জাহাজটি অবকাঠামোগত দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল বলে আমরা বেঁচে গেছি। না হলে, জাহাজটি দুমড়ে মুচড়ে যেতো। আমরা কেউ হয়তো বেঁচে থাকতাম না। অত্যন্ত ভয়াবহ অবস্থা ছিল। কারো হাত থেকে রক্ত ঝরছে, কারো পা, কারও মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। জাহাজের পুরো ডেকে তখন রক্ত আর রক্ত...।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার পর বড় বড় ঢেউ এসে ধাক্কা দিতে থাকে। ঢেউয়ের তোড়ে আমাদের জাহাজ একবার সামনে যায়, আবার পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। তখন আমরা চিন্তায় পড়ে গেলাম জাহাজ যদি গিয়ে জেটিতে আঘাত করে তখন জাহাজও ধ্বংস হবে, জেটিও ধ্বংস হবে। ওই অবস্থায় তাড়াতাড়ি আমরা সবাই মিলে রশি পাস করলাম। এরপর আমরা গাড়ি, হেলিকপ্টারের জন্য দৌড়াদৌড়ি শুরু করলাম। ইউএন হেড কোয়ার্টারে যোগাযোগ করলাম। কেউ কোনও গাড়ি পাঠাতে পারছে না। গাড়ি আসতে যখন দেরি হচ্ছে তখন খুব চিন্তা হচ্ছিল যে, আল্লাহ না করুক যারা আহত হয়েছেন তাদের মধ্যে যদি কেউ মারা যায়! কারণ, আমাদের মধ্যে গুরুতর আহতও ছিল। গাড়ি আসতে দেরি হচ্ছে কারণ, বিস্ফোরণে কয়েক মাইল পর্যন্ত রাস্তা ব্লক হয়ে গেছে। তাই রাস্তা ক্লিয়ার না করে কেউ আসতে পারছে না। পরে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে করতে রাতে ১২টার দিকে আমরা হাসপাতালে গিয়েছি।’

৪ আগস্টে বৈরুতবন্দরে বিস্ফোরণের স্মৃতিচারণ করছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘বিজয়’ এর অধিনায়ক কমডোর জয়নুল আবেদিন।

সেই ভয়াবহ মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে জয়নুল আবেদিন আরও বলেন, ‘ঘটনার পর আমাদের কারও মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। আমাদের মনে হয়েছে, কেয়ামতের মতো কোনও ঘটনা ঘটে গেছে। বিস্ফোরণের শব্দ এত বিকট ছিল, আমাদের অধিকাংশের কানের পর্দা ফেটে গেছে। এখনও অনেকে কানে ভালোভাবে শুনছেন না।’

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আমরা খুব ভালো চিকিৎসা পেয়েছি। যেই কারণে ইতোমধ্যে আমাদের অনেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন।  বাকি দুয়েকজন আছেন, তারাও অনেকটা সুস্থ কিন্তু আরও কিছুদিন তাদেরকে চিকিৎসকের ফলোআপে থাকতে হবে।’

বৈরুতে সেই বিস্ফোরণে ভয়াবহতার একটি দৃশ্য।

বিস্ফোরণে জাহাজের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের জাহাজটির অবকাঠামোগত অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জাহাজের রাডারের অ্যান্টেনা ভেঙে পড়েছে। অ্যালাইনমেন নষ্ট হয়েছে। যেসব যন্ত্রপাতি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এগুলোর অধিকাংশ ছিল ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি এবং এগুলো খুব সফস্টিকেটেড যন্ত্রপাতি ছিল। তাই এগুলো মেরামত করা খুব দরকার ছিল। পরে আমরা সেগুলো তুরস্কের সহযোগিতায় ঠিকঠাক করে ১০ হাজার কিলোমিটার সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছেছি।’

এত কিছুর পরও এই শান্তিরক্ষা মিশন সফল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ করে আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছে। এই শান্তিরক্ষা মিশনে আমরা বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছি। বিশেষ করে জার্মানি, গ্রিস, ব্রাজিল, তুরস্কের মতো দেশের নৌবাহিনীর সঙ্গে কাজ করে আমরা অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। এছাড়াও আমরা লেবাননের নৌবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। লেবাননে আমাদের এক লাখ ৮০ হাজার প্রবাসী রয়েছে। যাদের অনেকে সুচিকিৎসা নেওয়ার মতো অবস্থাতেই ছিল না। আমরা নিয়মিত তাদেরকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। এইসব কাজ-কর্মের মধ্যদিয়ে বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিস্ফোরণে ঘটনায় ভয়াবহ আহত হন নৌবাহিনীর সিইপিআর আব্দুর রশীদ। সেদিন স্মৃতিচারণ করেন তিনি।

বিস্ফোরণের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছেন জাহাজে থাকা নৌবাহিনীর সিইপিআর পদে কর্মরত আব্দুর রশিদ। বিস্ফোরণে ছিটকে পড়ে তিনি মাথায়, ঘাড়ের ডান পাশে বড় ধরনের আঘাত পেয়েছেন।

ঘটনার সম্পর্কে জানতে চাইলে আব্দুর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিয়মিত টহল শেষ করে এসে স্থানীয় সময় বিকেল ৪টার দিকে জাহাজ জেটিতে নোঙর করে আমরা স্বাভাবিক কাজ-কর্ম করছিলাম। এর মধ্যে বিকেল পৌনে ৬টার দিকে এই বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে আমি উড়ে গিয়ে ডেকের রেলিংয়ের ওপর গিয়ে পড়ি। এরপর থেকেই পুরোপুরি সেন্সলেস হয়ে যাই। চারদিন পর হাসপাতালে আমার সেন্স ফিরে আসে। পঞ্চম দিন আমি সামান্য কথা বলতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, বিস্ফোরণটা এত বিকট ছিল আমি বলে বোঝাতে পারবো না। আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং আত্মীয়-স্বজনের দোয়ায় হয়তো বেঁচে গেছি। আল্লাহ আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছেন।

আব্দুর রশিদ বলেন, ‘বিস্ফোরণে মাথায় বড় ধরনের আঘাত পেয়েছি। চিকিৎসকরা প্রথমে মাথায় অপারেশন করতে হবে ভেবেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আর অপারেশন করতে হয়নি। তবে মাথায় প্রচুর ইনজেকশন দিয়েছেন। বিস্ফোরণে আমার ডান হাতের ডিস্ক সরে গেছে। এর জন্য ৫বার অপারেশন করতে হয়েছে। এখন সেখানে আলাদা ক্লিপ লাগিয়ে দিয়েছেন চিকিৎসকরা।’

বিস্ফোরণে আহত এলএস পদে কর্মরত আজিজুল হক জানান তার অভিজ্ঞতার কথা।

বিস্ফোরণে আহতদের আরেকজন হলেন, এলএস পদে কর্মরত আজিজুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ঘটনার ভয়াবহতা এত প্রকট ছিল! এখন মনে হয় আমরা মৃত্যুর পর পুনরায় জীবন ফিরে পেয়েছি। অন্যান্য দিনের মতো আমরা স্বাভাবিক ছিলাম। জাহাজ নোঙর করার পর কিছু শিডিউল কাজ থাকে আমরা সেগুলো করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ বিকট শব্দ হয়ে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। বিস্ফোরণে আমি উড়ে গিয়ে পড়ি, এতে আমার হাত ভেঙে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিস্ফোরণে জাহাজের রাডার ভেঙে যায়। সবকিছু তছনছ হয়ে পড়ে। পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।’

 

/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে