রাজশাহী মহানগরীর পদ্মা নদীর কাছে টি বাঁধ সংলগ্ন বাবলাবন বধ্যভূমি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ এর উদ্বোধন করা হয়েছে। সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) সকাল ১১টায় ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এই স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। উদ্বোধনের পর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি অপর্ণ করেন সিটি মেয়র, রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাসহ বীর মুক্তিযোদ্ধারা। পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর শহীদদের স্মরণে এক মিনিটি নীরবতা পালন ও তাদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এরপর বিভিন্ন সংগঠন ও শ্রেণিপেশার মানুষ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ‘মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থানসমূহ সংরক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের’ আওতায় বধ্যভূমি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করেছে এলজিইডি রাজশাহী। স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন রাসিক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, হানাদারবাহিনী তাদের নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করতে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদরবাহিনীর সহযোগিতায় আত্মসমর্পণের প্রাক্কালে দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পীসহ বহু গুণীজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ থেকে বোঝা যায় পরাজয়ের শেষ মুহুর্তেও রাজাকার-আলবদর বাহিনী দেশের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে গেছে। এমনকি স্বাধীনতার পর তারা সক্রিয় থেকেছে। রাজাকার-আলবদরবাহিনীর উত্তরসূরীরা এখনও সক্রিয়। দেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। তাদেরকে শেকড় থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। স্বাধীন দেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের কোনও স্থান হবে না।
মেয়র আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর যে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য জীবন দিয়ে গেছেন, সেই সোনার বাংলা গড়ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে আগামী কয়েক বছর পর আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস বাঙালি জাতির বেদনাবিধুর দিন। এই দিনে আমরা বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করছি। এটি ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন হয়ে থাকবে।
এমপি ফজলে হোসেন বাদশা আরও বলেন, আজকে এই বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে বলতে চাই, যারা এখনও পাকিস্তানের দিকে তাকিয়ে থাকেন, মনে করেন পাকিস্তানের ধারায় দেশ পরিচালিত হবে, তারা মীর জাফর। বঙ্গবন্ধুর কথা মতো, তাঁর আদর্শ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার সঠিকপথে দেশকে পরিচালিত করছে, আগামীতেও করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন এলজিইডি রাজশাহীর নির্বাহী পরিচালক মো. সানিউল হক। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর রুহুল আমিন প্রামাণিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান রাজা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান খান আলম।
জানা গেছে, রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধের ‘টি-গ্রোয়েন’ সংলগ্ন বাবলাবন বধ্যভূমিতে ১৭ বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ অজানা সংখ্যক মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করা হয় একাত্তরের ২৫ নভেম্বর। এতদিন সেখানে ছিল না কোনও স্মৃতিসৌধ। শুধু একটি স্মৃতিফলকই সাক্ষ্য দিত সেই গণহত্যার। তবে এবার সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। রয়েছে সীমানা প্রাচীর এবং দৃষ্টিনন্দন ফটক।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করেছে। এ বছরেরই মার্চে কাজ শুরু হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একাত্তরের বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা রাজশাহীতে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তার অন্যতম সাক্ষী পদ্মা পাড়ের টি-গ্রোয়েন সংলগ্ন এই বাবলাবন বধ্যভূমি। বিজয়ের পরপর ৩১ ডিসেম্বর রাজশাহীর পদ্মাচর শ্রীরামপুর এলাকার এই বধ্যভূমি থেকে একই দঁড়িতে বাঁধা ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। বধ্যভূমির বেশির ভাগ অংশ এখন পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। তারপরও সেখানে ছুটে যেতেন মুক্তিযোদ্ধা ও স্বজনহারা মানুষ।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ১৯৯৫ সালের ২৫ নভেম্বর বাবলাবন বধ্যভূমি স্মৃতি ফলকের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন শহিদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মীর আব্দুল কাইয়ুমের স্ত্রী অধ্যাপক মাসতুরা খানম। এরপর ২০১১ সালে এই বধ্যভূমিতে আবারও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কথা জানানো হয়। অবশেষে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করল দুটি মন্ত্রণালয়।
এ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন রাজশাহী মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ডা. আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, রাজশাহী মহানগরজুড়ে ২৩টি বধ্যভূমি রয়েছে। এগুলো সংরক্ষণের জন্য আমরা অনেক কথা বলেছি। কিন্তু আগের কোনও সরকার সেগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য আমরা খুশি। আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই। আশা করি, রাজশাহী শহরের অন্য বধ্যভূমিগুলোও যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।








