ফরিদপুরের বোয়ালমারীর রুপাপাত ইউনিয়নের কাটাগড় গ্রামে শুরু হয়েছে ঐতিহাসিক কাটাগড়ের মেলা। করোনার কারণে গতবছর মেলা বন্ধ থাকলেও এবার তেমন নির্দেশনা নেই। কয়েকশত একর এলাকাজুড়ে তিন দিনব্যাপী এ মেলা বসে। যা দক্ষিণ বাংলার বৃহত্তর মেলা হিসেবে পরিচিত। মেলাটি প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন। এটি দেওয়ান শাগের শাহর মেলা হিসেবে পরিচিত। মেলাটি ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিবছর ২৬ মার্চ, বাংলা সনের ১২ চৈত্র সাধক দেওয়ান শাগের শাহ (রহ.) এর উফাত দিবসের ওরস উপলক্ষে বসে এই মেলা। আনুষ্ঠানিকভাবে তিন দিনের মেলা বলা হলেও সপ্তাহব্যাপী থাকে।
ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলনের আধ্যাত্মিক গুরু দেওয়ান সাগের শাহ্ (রহ.) অষ্টাদশ শতকের কোনও একসময় আস্তানা গাড়েন ফরিদপুরের কাটাগড়ে। শাগের শাহ (রহ.) ব্রিটিশ বিরোধী ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের অন্যতম নেতা মজনু শাহর আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে পরিচিত হলেও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ মজনু শাহের শাগরেদ হিসেবে দাবি করলেও তিনি আধ্যাত্মিক শক্তি ও বিভিন্ন অলৌকিক মাজেজার অধিকারী ছিলেন বলে স্বীকার করে নিয়েছেন সব ঐতিহাসিকরা। উনবিংশ শতকের চল্লিশের দশকের কোনও একবছর ১২ চৈত্র মৃত্যু হয় তার। কারও কারও মতে ওই দিন তিনি নিজেই কবরস্থ হয়ে দেহ বদল করেন। তখন থেকেই এ দিবস উপলক্ষে সারাদেশ থেকে হাজার হাজার ভক্ত সমবেত হন কাটাগড়ে। বসে মেলা, ফকির-সন্ন্যাসী ভক্তরা আসর জমান ভক্তিমূলক সংগীতের। নানা স্থান থেকে ভক্তরা আসেন মানত নজরানা নিয়ে। ১১ চৈত্র থেকে শুরু হওয়া তিনদিনের এই মেলা ১৩ চৈত্র শেষ হলেও এর রেশ থাকে মাসব্যাপী।
বিশেষ করে ১২ চৈত্র মেলা ও মাজার প্রাঙ্গণে তীল ধরনের জায়গা থাকে না। মেলায় রয়েছে সাঁজ-বাতাশার দোকান, দুই থেকে তিনশ’ প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান ও খাবার হোটেল, নাগরদোলা, যাদু প্রদর্শনী, ভ্যারাইটি শো, মোটরবাইক শো, ফার্নিচার সামগ্রীসহ হরেক রকম খেলনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থ সামগ্রীর কয়েক হাজার দোকানপাট।
মেলা উপলক্ষে আশ-পাশের বেশ কয়েক গ্রামের বাসিন্দারা মেতে উঠেছে উৎসবের আমেজে।
মাইটকুমরা গ্রামের সিদ্দিক খান বলেন, ‘জন্মের পর থেকে কাটাগড়ের মেলার নাম শুনতেছি। বাপ-দাদার হাত ধরে মেলায় যাওয়া শুরু এখন বয়স ৬২। এ মেলা আমাদের এলাকার ঐতিহ্য। বিভিন্ন স্থান থেকে আরও তিনদিন আগে থেকে আত্মীয়-স্বজন হাজির হয়েছেন।’
ভুলবাড়িয়া গ্রামের সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘কাটাগড়ের মেলা অত্র এলাকার ইতিহাস। মেলাকে ঘিরে আশপাশের প্রায় অর্ধশত গ্রামজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ। গ্রামের অনেক মানুষ ঈদ পূজায় বাড়ি না এলেও এ মেলায় আসেন।’
মেলা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মশিউল আজম বাবু মিয়া বলেন, কাটাগড় মেলা এই এলাকায় নাম করা একটি মেলা। মেলায় এক সময় ঘোড়া দৌড় হতো এখন আর তা হয় না। ১২ চৈত্র মেলা অনুষ্ঠিত হয় কিন্তু ১২ চৈত্রর ৫-৬ দিন আগে থেকে মেলা শুরু হয়ে যায়। গত বছর করোনার কারণে মেলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ বছর প্রশাসন থেকে কোনও নির্দেশ জারি হয়নি।
বোয়ালমারী থানার ওসি নুরুল আমীন জানান, এটি একটা পুরাতন মেলা। গতবার বন্ধ ছিল, এবার আমাদের কাছে বন্ধের কোনও নির্দেশনা ছিল না। তারপরও করোনা পরিস্থিতির কারণে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ঝোটন চন্দ্র জানান, মেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে প্রচার চালানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।









