রাজশাহীতে পানির দাম এক লাফে তিন গুণ বাড়ছে। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন মূল্য কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজশাহী পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ওয়াসা)।
রাজশাহী ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, প্রতি এক হাজার লিটার পানি উত্তোলন, পরিশোধন ও সরবরাহে ওয়াসার খরচ হয় আট টাকা ৯০ পয়সা। এতদিন আবাসিক সংযোগে প্রতি এক হাজার লিটার পানির দাম দুই টাকা ২৭ পয়সা ধরা হতো। বর্তমানে বেড়ে হচ্ছে ছয় টাকা ৮১ পয়সা। বাণিজ্যিক সংযোগের ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি থেকে হাজার লিটার পানির মূল্য ধরা হবে ১৩ টাকা ৬২ পয়সা। এখন এই পানির দাম চার টাকা ৫৪ পয়সা। আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই তিন গুণ দাম বাড়ানো হচ্ছে।
আবাসিক ও বাণিজ্যিক যেসব সংযোগে মিটার নেই সেগুলোর ক্ষেত্রে সংযোগ পাইপের ব্যাস এবং ভবনের তলার ওপর নির্ভর করে মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আবাসিকে আধা ইঞ্চি পাইপে নিচ তলার জন্য মাসে সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা এবং দশ তলার জন্য ৮২৫ টাকা মূল্য ধরা হবে। এক ইঞ্চি পাইপে নিচ তলায় ৩৭৫ টাকা এবং দশ তলায় দুই হাজার ৭০ টাকা। দ্বিতীয় থেকে নবম তলা পর্যন্ত কিংবা দশ তলার ওপর তলার জন্য পানির বিল আনুপাতিক হারে বাড়াবে।
আরও পড়ুন: রাজশাহীতে ওয়াসার পানিতে ক্ষতিকর ‘কলিফর্ম’ ব্যাকটেরিয়া
যেকোনও ধরনের আবাসিক ভবনে দেড় ইঞ্চি পাইপে পাঁচ হাজার ৬২৫ টাকা, দুই ইঞ্চিতে সাত হাজার ৫০০, তিন ইঞ্চিতে নয় হাজার ৩৫০ এবং চার ইঞ্চিতে ১১ হাজার ২৫০ টাকা ধরা হয়েছে। বাণিজ্যিক সংযোগের ক্ষেত্রে নিচ তলায় আধা ইঞ্চি পাইপে মাসিক ৩০০ টাকা এবং দশ তলায় এক হাজার ৬৫০ টাকা মূল্য ধরা হয়েছে। এক ইঞ্চি পাইপে নিচ তলায় ৭৫০ টাকা এবং দশ তলায় চার হাজার ১৪০ টাকা ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় থেকে নবম এবং দশতলার ওপরের তলার জন্য আনুপাতিক হারে বিল বাড়বে। বাণিজ্যিকে দেড় ইঞ্চি পাইপের জন্য ১১ হাজার ২৫০ টাকা, দুই ইঞ্চিতে ১৫ হাজার, তিন ইঞ্চিতে ১৮ হাজার ৭৫০ এবং চার ইঞ্চিতে ২২ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হয়েছে।
পানির দাম বাড়ানো অযৌক্তিক দাবি করে রাজশাহী ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার আলী বলেন, রাজশাহী ওয়াসা বর্তমানে যে সেবা দিয়ে আসছে, তাতেই তারা টাকা বেশি নিচ্ছে। সকাল ও রাতের কিছু সময়ে পানি পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে কালো পানি বের হয়। এসব পানি খাওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, করোনা মহামারির ধকল কাটিয়ে ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, এই সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ বিল বেড়ে গেলো। এখন পানির দাম বাড়ালে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভাড়া বেড়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
শিক্ষানগর রাজশাহীতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মেস ও বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। হঠাৎ পানির দাম তিন গুণ বাড়লে মেস ও বাসার ভাড়া বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা ইতোমধ্যে মেসমালিকের মাধ্যমে ফেব্রুয়ারি থেকে পানির বিল ও ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি শুনেছেন। অনেক মেসমালিক ভাড়া বৃদ্ধির জন্য অজুহাত খুঁজছেন। পানির দাম বাড়লে তারা আরও সুযোগ পেয়ে যাবেন।
রাজশাহী মেসমালিক সমিতির সভাপতি এনায়েতুর রহমান বলেন, পানির দাম বাড়ানো হলে সেই প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপরেই বেশি পড়বে। এ কারণে তারা চান, পানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে ওয়াসা যেন সরে আসে।
রাজশাহী ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) জাকীর হোসেন বলেন, পানির মূল্য দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে এখানে অনেক কম। এতদিন কম মূল্যে পানি সেবা দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের আয় দিয়ে চলার মতো সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা চলছে। পানির উৎপাদন খরচও বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে সেবার মান। তাই পানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নগরবাসীর অসন্তোষের বিষয়ে জাকীর হোসেন বলেন, সম্প্রতি নগরজুড়ে বিপুল পরিমাণ উন্নয়নকাজ চলছে। সেজন্য অনেক সময় পাইপ ফেটে বা কেটে যায়। তারা নগরবাসীকে আরও কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন সুপেয় পানি দিতে পারেন, সেই চেষ্টা করছেন বলে জানান।
সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ শাখাকে আলাদা করে ২০১০ সালের ১ আগস্ট রাজশাহী ওয়াসা প্রতিষ্ঠা হয়। এখন ১০৩টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে তা পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে। নগরীতে পানির চাহিদা প্রতিদিন ১১ কোটি ৩২ লাখ লিটার। তবে ওয়াসা নয় কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতে পারে। ৭১২ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে এ পানি নগরীতে সরবরাহ করা হয়।
সম্প্রতি ওয়াসা পানি পরীক্ষা করে দেখেছে, পাইপের পানিতে রয়েছে ক্ষতিকর কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া। কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া মূলত মানুষ ও পশু-পাখির বিষ্ঠা থেকে তৈরি হয়। এই ব্যাকটেরিয়া সংমিশ্রিত পানি খেলে তাৎক্ষণিক ডায়রিয়া ও বমিসহ পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। খাওয়ার পানিতে এই ব্যাকটেরিয়ার কোনো সহনীয় মাত্রা নেই। এ খবর জানাজানি হলে নগরবাসীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এমন সময় পানি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে অসন্তোষ আরও বেড়েছে।









