একদিকে কৃষকদের জমি হারানোর ভয়ে বিরোধিতা, অন্যদিকে বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হাতছানি—এর মধ্যেই এগিয়ে চলেছে নাটোরের লালপুর উপজেলায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন) প্রতিষ্ঠার কাজ। শুরুতে কাগজে-কলমে থাকলেও এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি বাস্তবায়ন এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। এটি স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে এরই মধ্যে এলাকাটি সফর করেছে ভারতের একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল। রবিবার চার সদস্যবিশিষ্ট ভারতীয় প্রতিনিধি দলটি ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে স্থানীয় রেল, সড়ক ও বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়সহ বিভিন্ন কাজে। এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তও সংগ্রহ করেছেন তারা।
ভারতীয় প্রতিনিধি দলে ছিলেন মাহিন্দ্র কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স চেন্নাইয়ের সিনিয়র ম্যানেজার টি. সত্যমূর্তি, প্রোজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার এন. প্রভাকরন, প্রাইস ওয়াটারহাইস কুপারস অভিষেক মুখার্জী ও দেবায়ন বিশ্বাস।
লালপুর উপজেলা কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটি উপজেলার লালপুর, বালিতিতা, বাকনাই, আরজি বাকনাই, রসুলপুর, চরজাজিরা ও বন্দোবস্ত গোবিন্দপুর মৌজার মোট ৩৪১৮.৪৬ একর জায়গার ওপর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত স্থানে ব্যক্তিগত ভূসম্পত্তি রয়েছে ২৯৫১.১২ একর, খাস জমি ৩৯৭.৩৪ একর এবং বন্দোবস্ত গোবিন্দপুর মৌজায় মোট ৭০ একর।
সকাল ১০টা থেকে প্রতিনিধিদল নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের গেস্ট হাউজে স্থানীয় সড়ক বিভাগ, ঈশ্বরদী রেলওয়ে বিভাগ, ঈশ্বরদী বিমানবন্দর বিভাগ, লালপুর বিদ্যুৎ বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এসময় তারা প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। মতবিনিময় ও তথ্য সংগ্রহ শেষে তারা অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিমানবন্দর, রেলওয়ে বিভাগ পরিদর্শন করেন।
প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, লালপুর বাজারের পাশেই রয়েছে পদ্মা নদী এবং নদীর অপর পারে রয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলী জমি। মাঠের পর মাঠ আখ আর সরিষাসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফসল। কৃষকরা কাজে রত। ভারতীয় প্রতিনিধিদলকে পরিদর্শনে দেখে তারা কাজ ফেলে ছুটে আসেন।
তারা জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চল করার ঘোষণায় অধিকাংশ কৃষক জমি হারানোর সম্ভাবনায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাদের দাবি, যারা অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পক্ষে কথা বলছেন তারা মূলত কৃষক নন। প্রকৃত কৃষকরা অর্থনৈতিক অঞ্চল করার বিপক্ষে। অবশ্য কৃষকদের মধ্যে অল্প সংখ্যক আছেন যারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের পক্ষে রয়েছেন।
কৃষকদের বক্তব্য
চর লালপুর গ্রামের কৃষক মহাতাব আলী মধু (৬০) জানান প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল এলাকায় তার ৫০-৬০ বিঘা জমি রয়েছে। একই এলাকার কৃষক এজাহার আলী(৭০) জানান প্রস্তাবিত অঞ্চলে তার ৩৮ বিঘা জমি রয়েছে। তারা বংশপরম্পরায় এখানে কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। জমি চলে গেলে কিভাবে জীবন নির্বাহ করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় কাটছে সময়। জমি অধিগ্রহণের বিনিময়ে টাকার প্রশ্নে দুজনেই জানান, ভূসম্পত্তিসম্পন্ন কৃষক হিসেবে জমি তাদের কাছে টাকার চেয়ে মূল্যবান।
চরলালপুর গ্রামের নবীর শেখ(৬০), সুরমান হোসেন, মাহবুব প্রমুখ কৃষক জানান, তাদের জমিতে পদ্মার পানি ওঠে না বলে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল আবাদ করতে পারেন। অনেকের আম বাগান রয়েছে। ৭৫ ভাগ মানুষ কৃষিজীবী মানুষের আবাদ করার জমি ‘সরকার নিয়ে নিলে’ তারা কিভাবে জীবন যাপন করবেন বলে প্রশ্ন রাখেন।
কৃষকদের মধ্যে যারা অর্থনৈতিক অঞ্চলের পক্ষে তাদের সম্পর্কে বালিতিতা গ্রামের দেলবর ব্যাপারির ছেলে মনতাজ ব্যাপারী বলেন, তারাই এর পক্ষে কথা বলছে যাদের নিজস্ব জমিজমা নেই।
রামকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা আখের জমির মালিক আবু হানিফ জানান প্রস্তাবিত অঞ্চলে অবস্থিত বিলে তার ১০ বিঘা জমি রয়েছে। তিনি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পক্ষে, কারণ জমি চলে গেলে তাদের কষ্ট হবে সত্যি, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর উপকার পাবে।
তিনি বলেন, সরকার জমি কিনে নিলে সেই টাকা দিয়ে অন্য জায়গায় জমি কিনে চাষাবাদ করবো। কোনও ক্ষতির আশঙ্কা করছি না।
দক্ষিণ লালপুর গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম ও আক্তার জানান, প্রস্তাবিত এলাকায় দুজনের মোট ৭০ বিঘা জমি রয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল হোক তারা চান না। তাদের আশঙ্কা, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘অশিক্ষিত কৃষকদের’ চাকরি হবে না। স্থানীয় সংসদ সদস্যকে ধরে দলীয় লোকজন চাকরি নেবে, মাঝখানে তারা পুরুষানুক্রমে পাওয়া জমি হারাবেন।
কৃষকদের এসব অভিযোগ নিয়ে কথা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, জমি কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে কিনে নেওয়া হবে। এতে কৃষকদের কোনও ক্ষতি হবে না। অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে বংশ পরম্পরায় তারাই বরং লাভবান হবেন।
তিনি আরও বলেন, লালপুর উপজেলায় মূলত কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক জোন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থনৈতিক জোন হলে এখানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বেড়ে যাবে। ফলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠবে। দেশি-বিদেশি শিল্প উদ্যোক্তাদের আহ্বান করা হবে। পাঁচ-সাত হাজার বেকার লোকের কর্মসংস্থান হবে।
কথা হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত নাটোর অর্থনৈতিক অঞ্চল লালপুর তথা নাটোরবাসীর কাছে সময়ের দাবি এবং আশীর্বাদস্বরূপ। এতে এলাকার হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। স্থানীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সন্ধ্যায় সার্বিক পরিদর্শন ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ শেষে ভারতীয় প্রতিনিধি দল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রস্তাবিত নাটোর অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এখানকার সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিপুল পরিমাণ খাস জমি, বিদ্যুতের সহজলভ্যতা, গ্যাস সরবরাহের সুযোগ, পানির সরবরাহ, চিকিৎসা সেবা ও কাঁচামালের প্রাপ্যতাসহ প্রয়োজনীয় সকল সুবিধাই রয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় এখানে সহজেই একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠতে পারে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলের ইতিবৃত্ত
২০১০ সালের ১ আগস্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন-২০১০ পাস করা হয়। বলা হয়, দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রফতানি বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণে উৎসাহ দেওয়ার জন্য পশ্চাদপদ ও অনগ্রসর এলাকাসহ সম্ভাবনাময় সকল এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করাই অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) গঠন করার মূল লক্ষ্য।
একই বছরের ৯ নভেম্বর বেজা গঠিত করা হয় এবং ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বেজার গভর্নিং বোর্ডের প্রথম সভায় পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে লালপুর-বাগাতিপাড়া আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ লালপুরে পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে নাটোর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার স্বপক্ষে ‘যৌক্তিক দিকগুলো’ তুলে ধরে বেজার কাছে আবেদন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের ২ মে স্থান নির্ধারণ ও সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে বেজার প্রকল্প পরিচালক নুরুন্নবী মৃধা উপজেলার চরাঞ্চলে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দেন।
এরপর থেকেই লালপুরে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার দাফতরিক কার্যক্রম শুরু হয়।
বেজা কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও মতামত
২০১৫ সালের ২১ নভেম্বর বেজার নির্বাহী সদস্য ও অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ আব্দুস সামাদ এনডিসি এবং ২৫ ডিসেম্বর নির্বাহী সদস্য ও অতিরিক্ত সচিব এসএম শওকত আলী প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করে জানান, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সকল সুযোগ সুবিধাই ওখানে রয়েছে। তারা আরও জানান, কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান ছাড়াও অঞ্চলে ইলেক্ট্রনিক পণ্যের কারখানাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যাবে।
/এইচকে/টিএন/








