স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন চোরাকারবারিরা

মোয়াজ্জেম হোসেন, লালমনিরহাট
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১৪:৪৭আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১৫:০৪

সৈয়দ আলীর ছেলে বুলবুল হোসেনের (৩৩) বাড়ি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার মুংলীবাড়ী (বর্মতল) সীমান্ত গ্রামে। এক সময় তিনি চোরাকারবারি দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। সীমান্তের অবৈধ পথে রাতের আঁধারে ভারতীয় গরু আনাই ছিল তার কাজ। ভারত থেকে একটি গরু পাচার করে আনতে পারলে পারিশ্রমিক পেতেন দুই হাজার টাকা। মোটা অংকের এই টাকার লোভে প্রায় প্রতিদিনই তিনি সীমান্ত পার হয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় গরু আনতেন। এভাবে অল্প কিছুদিনের মধ্যে তিনি কয়েক লক্ষাধিক টাকার মালিকও বনে যান।

চোরা কারবারি ছেড়ে এখন ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা শুরু করেছেন বুলবুল

হঠাৎ একদিন বিধি বাম! ২০১৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মুংলীবাড়ী গ্রামের ৮৪২ নম্বর মেইন পিলার সীমান্ত পথে ভারতে গরু আনতে গিয়ে কোচবিহার জেলার চ্যাংরাবান্ধা বিএসএফ ক্যাম্পের টহল দলের সদস্যদের হাতে ধরা পড়েন। আটকের পর তাকে বেদম মারপিট করেন বিএসএফ সদস্যরা। পরে কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয় তাকে। তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। কোচবিহার সাব জজ আদালতে তার দুই বছর জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের দণ্ড দেন আদালত। প্রায় ২৬ মাস সাজাভোগের পর গত বছরের ২৭ অক্টোবর ভারতের চ্যাংরাবান্ধা হয়ে লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশের মাধ্যমে দেশে ফেরেন বুলবুল। ২৬ মাস পর ‘জীবিত’ স্বামীকে ফেরত পেয়ে স্ত্রী তোতা বেগম যেন এক নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। জীবনকে নতুন করে সাজানোর সংগ্রামে নেমেছেন বুলবুল হোসেনও। চোরাকারবারি পেশা ছেড়ে এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য বুড়িমারী স্থলবন্দর এলাকায় জুতা-স্যান্ডেল ও মোবাইল ফ্লেক্সিলোডের দোকান দিয়েছেন। ক্রমে তার পুঁজি বাড়তে শুরু করেছে। এই পরিবর্তন শুধু ওই এলাকার বুলবুল হোসেনের নয়। তার মতো চোরাকারবারি পেশা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন হাজারও চোরাকারবারি সদস্য। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে স্থানীয়ভাবে ব্যবসা করছেন আলতাফ হোসেন (৪৩), মোহাম্মদ লাবিব হোসেন (১৮), আমিন আলী (৪৭), রুবেল হোসেন (২৪), নুর ইসলাম (২৮), জলিল হোসেনসহ (৪৪) আরও অনেকে। এমন পরিবর্তন ঘটেছে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, আদিতমারী ও সদর উপজেলার কয়েক শতাধিক চোরাকারবারি ব্যবসায়ীদের।

তবে এসব ব্যবসায়ীদের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারিভাবে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। স্থানীয়রা বলছেন, চোরাকারবারিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আনার জন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেওয়া দরকার। এতে সীমান্তে শুধু চোরাকারবারই বন্ধ হবে, তা নয়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও এক নতুন উচ্চতায় দেখা যাবে। এজন্য সীমান্ত এলাকায় সরকারিভাবেই গণমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

জানতে চাইলে বুলবুল হোসেন বলেন, ‘মোটা অংকের টাকার লোভে পড়ে জীবন বাজি রেখে আগে চোরাই পথে ভারত থেকে গরু নিয়ে আসতাম। চোরাচালান ব্যবসা করতে গিয়ে বিএসএফের হাতে ধরা পড়ে আর্থিক ও সামাজিকভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছি। সাজা ভোগ শেষে দেশে ফেরার পর বাবা সৈয়দ আলী ও ছোটভাই রবিউল ইসলামের সহযোগিতায় জুতা-স্যান্ডেল ও ফ্লেক্সিলোড ব্যবসা শুরু করেছি। এখন আগের তুলনায় অনেক ভালো আছি।’

একই কথা বলেন, মুদি দোকান ব্যবসায়ী আমিন আলী, আলতাফ হোসেন ও রুবেল হোসেন।

পাটগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, ’উভয় সীমান্তে বসবাসকারী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন না হওয়ায় চোরাকারবারিতে জড়াচ্ছেন স্থানীয় লোকজন। শুধুমাত্র বিজিবি-বিএসএফ দিয়ে পুরোপুরি চোরাচালান ব্যবসা রোধ করা সম্ভব নয়। এসব বন্ধ করতে চাইলে দুই দেশের সরকারকে সীমান্ত এলাকার মানুষের জন্য গণমুখী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এর মধ্যে উঠতি যুবকদের বেকারত্ব লাঘবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেমন জরুরি তেমনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও জরুরি। এতে সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ হবে বলে আশাকরি।’

চোরা কারবারি ছেড়ে এখন মুদি দোকান করছেন আমিন মিয়া

লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়ন সূত্র জানায়, বিগত ২০১০ সাল থেকে পাটগ্রাম উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন সীমান্তে চোরাকারবারি ব্যবসা কমতে শুরু করে। বর্তমানে ৭৫ শতাংশেরও বেশি নিচে নেমে এসেছে চোরাকারবার ব্যবসা। এ সংখ্যা প্রতি বছর কমছে। এছাড়া আহত ও আটকের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। উত্তরাঞ্চলের ঠাকুরগাঁও সীমান্তের মতোই লালমনিরহাটের লোহাকুচি সীমান্তেও আলোকিত সীমান্ত প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের কার্যক্রম খুব শীঘ্রই চালু করা হবে। জমি পাওয়া গেছে। অর্থের বরাদ্দও মিলেছে। এখন ’আলোকিত সীমান্ত’ বিনির্মাণের পালা।

লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের পরিচালক লে. কর্নেল আহমদ বজলুর রহমান হায়াতী বলেন, ’আগের তুলনায় সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের টহল বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সমন্বিত টহলও জোরদার করা হয়েছে। ফলে অন্যান্য সময়ের তুলনায় বর্তমানে সীমান্ত হত্যা যেমন কমেছে তেমনি চোরকারবারিও কমেছে। এখন অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন। স্থানীয়ভাবে এলাকায় নিজের পুঁজি দিয়ে তারা মুদি ব্যবসা করে সংসার সামলাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত এ সংখ্যা বাড়ছে। স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য আমরা সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছি।’

বিজিবির উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের (রংপুর) পরিচালক আনোয়ার শফি বলেন, ‘আমি বিজিবিতে নতুন যোগদান করেছি। বর্তমানে  সীমান্তে আগের তুলনায় চোরাকারবারি বহুলাংশে কমেছে। আশাকরি, আগামীতে সীমান্ত পথে বাংলাদেশি চোরাকারবার শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে এককভাবে বিজিবির পক্ষে চোরাকারবারি থামানো সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশ বা ভারতের চোরাকারবার ব্যবসার মধ্যে স্থানীয় রাজনীতির একটা ভূমিকা রয়েছে। এজন্য আমরা স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে চোরাকারবারিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করছি। এর বাইরেও আমরা ‘আলোকিত সীমান্ত’ নামে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে একটি পাইলট প্রকল্পও হাতে নিয়েছি। ওই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে, চোরাকারবারিদের হাতে-কলমে কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বনির্ভর হতে উজ্জীবিত করা। প্রকল্পটি বেশ প্রশংসিত হয়েছে। এ প্রকল্পটি অন্যান্য সীমান্তেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’

/বিটি/টিএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য সুখবর
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য সুখবর
মৌমাছির রানি হয়ে ওঠার রহস্য কী
মৌমাছির রানি হয়ে ওঠার রহস্য কী
তিন বছর নয়, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কীভাবে ভুল করলো দেশের প্রায় সব মিডিয়া
তিন বছর নয়, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কীভাবে ভুল করলো দেশের প্রায় সব মিডিয়া
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
অধিনায়ক হিসেবে ফিরেই জয় দেখলেন কুশল মেন্ডিস
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম