নিয়ম না মেনে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম হোসেন মন্টুর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন উপজেলার ২০ জন সরকারি কর্মকর্তা। গত ৩১ মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর এ অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে গত সোমবার (১২ জুন) বিষয়টি প্রকাশ হলে এ নিয়ে নানা আলোচনার সৃষ্টি হয়।
উলিপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম হোসেন মন্টু একই সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ অভিযোগকে তিনি ভিত্তিহীন ও বেআইনি বলে দাবি করেছেন।
অভিযোগপত্রে উপজেলার বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, ‘কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তারা এই মর্মে অভিযোগ করছি যে, গত কিছুদিন ধরে সমন্বয় সভা ও অন্যান্য সভা কিংবা দাফতরিক কার্যক্রমে আইনানুগ প্রক্রিয়ার বাইরে বিভিন্ন সুপারিশ করেন উপজেলা পরিষদের সম্মানিত চেয়ারম্যান মো. গোলাম হোসেন মন্টু। তা পালনে ব্যত্যয় হলে বিভিন্ন হুমকি, লোকজন পাঠিয়ে অপমান, অশোভন বাক্য ব্যবহার করে থাকেন। যা নিম্ন স্বাক্ষরকারীদের জন্য খুবই বিব্রতকর ও মানহানিকর।’
ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ‘গত ২২ মে সমন্বয় সভায় প্রকাশ্যে উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে বলেন, এ উপজেলায় তারা কীভাবে চাকরি করেন আজকের পর থেকে তিনি বুঝিয়ে দেবেন। মাঝে মাঝে বলেন, লাথি দিয়ে ফেলে দেবেন। এরকম নানাবিধ হুমকি দেন। ফলে আমরা নিরাপত্তাহীনতা ও অপমান থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করছি।’
অভিযোগপত্রে উপজেলা প্রকৌশলী কে কে এম সাদেকুল আলম, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শাহ্ মো. তারিকুল ইসলাম, পিআইও মো. সিরাজুদ্দৌলা, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সখিনা খাতুনসহ ২০ জন কর্মকর্তা সই করেছেন।
এদিকে, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন মন্টু তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা ইউএনও বরাবর এভাবে অভিযোগ দিতে পারেন না। এটি মূলত পিআইও এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের ষড়যন্ত্র। আমি তাদের কাজের জবাবদিহি করতে বলেছি বলে তারা অন্যদের প্রভাবিত করে এভাবে অভিযোগ দিয়েছেন। আমি তাদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
‘পিআইও সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন না। তিনি কাজ শেষ না করেই টাকা তুলে রাখেন। আর মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নানা অনিয়মে জড়িত। আমি এসব নিয়ে সবার সামনে জবাব চেয়েছি বলে তারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন।’ যোগ করেন উপজেলা চেয়ারম্যান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রকৌশলী কে কে এম সাদেকুল আলমকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
পিআইও সিরাজুদ্দৌলা বলেন, ‘উপজেলা চেয়ারম্যান আমাদের অপমান করেন, রাফ কথাবার্তা বলেন। এজন্য আমরা ইউএনও বরাবর অভিযোগ দিয়েছি।’
উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ইউএনওকে অভিযোগ দেওয়ার আইনগত ভিত্তি নিয়ে জানতে চাইলে পিআইও বলেন, ‘সেটি আমরা জানি না। ইউএনও স্যার আমাদের টিম লিডার। কোনও সমস্যা বোধ করলে আমরা তো তাকেই জানাবো।’ বিষয়টি নিয়ে তিনি ইউএনওর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সখিনা খাতুন স্বাক্ষর করার বিষয়টি স্বীকার করলেও এভাবে অভিযোগ দেওয়ার আইনগত বৈধতা নিয়ে কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমি এত কিছু জানি না। আমরা উপজেলার অফিসাররা একজোট হয়ে এটি দিয়েছি। যেহেতু ইউএনও স্যার আমাদের ঊর্ধ্বতন অফিসার সেজন্য তার কাছে অভিযোগ দিয়েছি। আইনগত দিক জানি না।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সিতে একজন উপজেলা চেয়ারম্যান ইউএনওর চেয়ে উচ্চ পদস্থ। উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এভাবে ইউএনওকে অভিযোগ দেওয়া যায় না। আর ইউএনও সেটি গ্রহণও করতে পারেন না। এটি বিধিবহির্ভূত। উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মাধ্যম হতে পারেন ইউএনও।’
ইউএনও শোভন রাংসা এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘অভিযোগপত্রটি জেলা প্রশাসক বরাবর অগ্রগামী করা হয়েছে।’
ইউএনও বরাবর এভাবে একজন উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এতে কোনও আইনগত বাধা আছে কিনা আমার জানা নেই।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বলেন, ‘ইউএনও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি। সরকারি অফিসাররা কেন্দ্রীয় সরকারের সদস্য। সুতরাং ইউএন’কে অভিযোগ দিতে আইনগত বাধা নেই। তবে এ ক্ষেত্রে ইউএনও কোনও ব্যবস্থা নেবেন না। তিনি অভিযোগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন। আমার কাছ অভিযোগপত্রটি এসেছে। আমি এটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা নেবো।’









