খাগড়াছড়ির পাহাড়ে মৌসুম অনুযায়ী নানা ধরণের ফলের চাষ হয়। চলমান মৌসুমের এমনই একটি ফল লটকন। একটা সময় অপ্রচলিত ফলের তালিকায় লটকনের নাম থাকলেও এখন অনেক প্রচলিত। সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর লটকনের জনপ্রিয়তাও বেশ বেড়েছে। টক-মিষ্টি স্বাদের হওয়ায় ইতোমধ্যে ফলটি সারাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রনব বড়ুয়া জানান, খাগড়াছড়ির মাটি ও আবহাওয়া লটকন চাষের উপযোগী। চলতি বছর ১৩৫ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষমাত্রা ১৮৮০ মেট্রিক টন। এর পাশাপাশি প্রায় প্রত্যেক চাষির বাড়িতেই দুই থেকে চারটা করে লটকন গাছ আছে। কম জমিতে বেশি ফলন পাওয়া যায় বলেই খাগড়াছড়িতে বেড়েই চলছে লটকন চাষ। তাছাড়া বাজারেও এ ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। চাহিদা আর ভালো মুনাফা দেখে গত তিন-চার বছর ধরে পাহাড়ের চাষিরাও শুরু করেছেন এ ফলের চাষ। বাড়ির আশেপাশে, অনাবাদি জমিতে চাষীরা এখন এই ফলের চাষ করছে। এ ফল থোকায় থোকায় ধরে।
খাগড়াছড়ি সদরের জামতলি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লটকন ফলে পুরো গাছকে আগলে রেখেছে। গাছের গোড়া থেকে শাখা-প্রশাখায়ও ফলে ফলে ছেঁয়ে গেছে। হলুদ রঙের লটকনে বাগানের গাছগুলো রঙিন হয়ে উঠেছে। পুরো এলাকায় এখন গাছভর্তি লটকন আর লটকন।
লটকন চাষি লিলি খীসা বলেন, ‘আমার বাগানে ৫০টির মতো লটকন গাছ আছে। চলতি মৌসুমে লটকনের আবাদ বেশ ভালো হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে ১২০ টাকা করে কেজি বিক্রয় করেছি। এখন ৬০-৭০ টাকায় এসেছে। যেখানে আমের কেজি ৫০-৬০ টাকা সেখানে লটকনের কেজি তার চাইতেও বেশি। এখন পর্যন্ত গাছ প্রতি লটকন বিক্রি করে চার-পাঁচ হাজার টাকা আয় হয়েছে। এখন গাছে যে পরিমাণ লটকন আছে, তাতে গাছ প্রতি আরও ৮-১০ হাজার টাকা বিক্রি করা যাবে।’
খাগড়াছড়ি শহরের তেতুলতলা এলাকার চাষী অনিমেষ চাকমা রিংকু বলেন, ‘আম বাগানে আমার ৩০টির মতো লটকন গাছ আছে। এসব গাছের যত্নও তেমন করতে হয় না, কিন্তু ফল পাওয়া যায় অনেক। এসব গাছ থেকেই লক্ষাধিক টাকা আয় হবে। আমি বানিজ্যিকভাবে শুধু লটকনের বাগান গড়ে তুলবো।’
খাগড়াছড়ি বাজারের শাপলা চত্ত্বর এলাকার ফল ব্যবসায়ী ভুট্টো বলেন, ‘প্রতিদিন আশপাশের এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ও খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতার আগমন ঘটে এখানে। এই এলাকার লটকন সুস্বাদু হওয়ায় দেশব্যাপী ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে। পাইকাররা এখানকার চাষিদের কাছ থেকে লটকন কিনে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করে থাকে।’
খাগড়াছড়ি হর্টিকালচার’র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মালেক বলেন, ‘পাহাড়ে খুব কম খরচে লটকন চাষ করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষে অনেক লাভবান হওয়া যায়। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় কয়েক বছর ধরে ব্যাপক পরিমাণ চাষ হচ্ছে। এই লটকন অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে দ্বিগুণ সুস্বাদু ও সম্পূর্ণ ফরমালিনমুক্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘লটকনে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে, দিনে দু-তিনটি লটকন খেলে শরীরের ভিটামিন সি’র চাহিদা পূরণ হয়। এ ছাড়া লটকনে রয়েছে নানা রকম পুষ্টি উপাদান যা শরীরকে সুস্থ রাখে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। রুচি বাড়াতে লটকন বেশ উপকারী। ভিটামিন সি, ত্বক, দাঁত ও হাড় সুস্থ রাখে। এই ফলে নানা রকম খনিজ উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ক্রোমিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম উল্লেখযোগ্য। এইসব উপাদান শরীরকে সুস্থ রাখে। প্রতি ১০০ গ্রাম লটকনে ৯ গ্রাম ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্রোমিয়াম থাকে। লটকনে ভিটামিন বি ও আয়রন পাওয়া যায়। খাদ্যশক্তির ভালো উৎস লটকন।’
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফরের উপপরিচালক কিশোর কুমার মজুমদার বলেন, ‘খাগড়াছড়ির প্রায় সকল কৃষকের বাগানে এখন লটকন ফল আছে। লটকন গাছ যেকোন জায়গায় হচ্ছে। ভালো ফলনও দিচ্ছে। লটকন বমি বমিভাব দূর করতে পারে। পাশাপাশি মানসিক অবসাদ দূর করতেও সাহায্য করে। এ ছাড়া গরমে তৃষ্ণা মিটাতে লটকন খাওয়া যায় কারণ এতে জলীয় অংশের পরিমাণ বেশি। ফলের পাশাপাশি লটকনের পাতাও ওষুধের কাজ করে। এর পাতা ও শিকড় খেলে পেটের নানারকমের অসুখ ও জ্বর ভালো হয়ে যায়। লটকনের বীজ গনোরিয়া রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। ডায়ারিয়া দূর করতে লটকনের পাতার গুড়া বেশ ভালো ফল দেয় বলেও জানা যায়।’







