পুলিশের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ

বিচারপ্রার্থী সেই মা-মেয়ের সাজা বাতিল করে খালাস দিয়েছেন আদালত

কক্সবাজার প্রতিনিধি
০৮ মার্চ ২০২৬, ১৬:৩৯আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৬:৫৭

ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা বাতিল করে কক্সবাজারের পেকুয়ার সেই মা-মেয়েকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলমের আদালত। শনিবার বিকাল ৪টার দিকে আপিল শুনানি শেষে আদালত ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই সাজা বাতিল করেন।

কক্সবাজারের পেকুয়া থানার ভেতরে পুলিশের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ ওঠে রেহেনা মোস্তফা (৪২) নামে ওই নারী ও তার মেয়ে জুবাইদা বেগমকে (২১)। এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠান।

সাজা বাতিলের পর শনিবার সন্ধ্যায় রেহেনা মোস্তফা ও তার মেয়ে জুবাইদা কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরে তারা চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।

এর আগে বুধবার বিকালে পেকুয়া থানায় ডেকে নিয়ে এই দুই নারীকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরে ওইদিন থানার ভেতরেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে দুজনকে এক মাস করে সাজা দেন পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম। এরপর বুধবার সন্ধ্যায় মা-মেয়েকে কক্সবাজার কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুবাইদার জন্মের পর রেহেনা ও তার স্বামীর বিচ্ছেদ হয়। ২০১৩ সালে ২৩ মে জুবাইদার বাবার মৃত্যু হলে সম্পত্তির ভাগের জন্য চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু তারা জুবাইদাকে অস্বীকার করেন। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা করেন জুবাইদা। আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয় পেকুয়া থানাকে। মামলার তদন্তভার যায় উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষের কাছে।

স্বজনদের অভিযোগ, এসআই পল্লব তদন্ত প্রতিবেদন দিতে রেহেনা ও তার মেয়ে জুবাইদার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তাকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। টাকা নেওয়ার পরও আদালতে জুবাইদার বিপক্ষে প্রতিবেদন দেন তিনি। এতে টাকা ফেরত চেয়ে এসআই পল্লবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন রেহেনা ও জুবাইদা। তবে টাকা ফেরত না দেওয়ায় গত ১৩ জানুয়ারি এ বিষয়ে তারা কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে কথা হয় ভুক্তভোগী রেহেনা মোস্তফার সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে বুধবার আমাদের থানায় ডেকেছিল পুলিশ। আমি ও আমার মেয়ে থানায় গেলে পুলিশ আমাদের প্রচণ্ড মারধর করে। মারধরের পর থানায় ইউএনও আসেন। আমরা তাকে পুলিশের নির্যাতনের কথা বলি। তখন আমরা মনে করেছিলাম ইউএনও স্যার আমাদের রক্ষা করতে এসেছেন। কিন্তু তিনি আমাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখার পরও কিছু না বলে ওপরে (ওসির রুমে) চলে যান। ঘণ্টা দেড়েক পর সেখান থেকে নেমে যে-যার মতো তারা চলে গেছেন। এরপর পুলিশ আমাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হচ্ছে বলে একটি কালো গাড়িতে তুলে নেয়।’

রেহেনা বলেন, ‘হাসপাতালের কথা বলে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। রামু এলাকায় ইফতারের সময় হলে অনেক আকুতি-মিনতি করেছি, তবু একটু পানিও দেয়নি পুলিশ। অথচ ইফতারের জন্য তাদের হাতে জুস ছিল, এটা-ওটা ছিল। খালি পেটে কাজ আছে বলে আমাদের ইফতারটাও করতে দেয়নি।’

কারাগারে নেওয়ার পর তাদের শরীরের আঘাত দেখে কারা কর্তৃপক্ষ প্রথমে গ্রহণ করতে চাননি বলে দাবি রেহেনা মোস্তফার। তিনি বলেন, ‘প্রথমে কারা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে চাননি। কারা কর্তৃপক্ষ বলেন, “কাগজপত্র ঠিকমতো আনো, ওদের আঘাত বেশি। রাতে মারা গেলে আমরা কী জবাব দেবো।” পরে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলে ই-মেইলে কী কী কাগজপত্র পাঠানোর পর কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের গ্রহণ করেন। পরদিন সকালে আমরা জানতে পেরেছি, আমাদের এক মাস করে সাজা দিয়েছেন ইউএনও।’

এই ঘটনায় ইউএনও, ওসি, এসআই পল্লব কুমার ঘোষ ও নির্যাতনকারী পুলিশ সদস্যদের শাস্তি দাবি করেন রেহেনা মোস্তফা। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমি আপনার পেকুয়ার মেয়ে, আমি নির্যাতিত, আমি সুষ্ঠু বিচার চাই।’

শুক্রবার ইউএনও মাহবুবুল আলম জানিয়েছিলেন, থানার ভেতর তার সামনে পুলিশের ওপর হামলা হয়। তাই তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতে দুজনকে সাজা দিয়েছেন। সাজার বিষয়ে মা-মেয়েকে সামনাসামনি জানানো হয়েছিল।

তবে মুক্তি পাওয়ার পর রেহেনা মোস্তফার অভিযোগ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজার বিষয়ে তারা থানায় অবস্থানকালে কিছুই জানতেন না। তাদের সামনে বিচারিক কার্যক্রম হয়নি। কক্সবাজার পৌঁছে কারাগারে প্রবেশের পরদিন সকালে সাজার বিষয়টি জানতে পেরেছেন।

রেহেনা মোস্তফার এই অভিযোগের বিষয়ে পেকুয়া থানার ওসি শুক্রবার সাংবাদিকদের ডেকে বলেছিলেন, ‘ওই দুই নারী খুবই উচ্ছৃঙ্খল। তারা বিভিন্ন সময় থানায় এসে ধর্ষণ মামলার হুমকি দিতেন। বিষের বোতল হাতে করে নিয়ে এসে বিষপানের হুমকি দিতেন। তাদের বিরুদ্ধে থানায় পাঁচটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। গত বুধবার পুলিশের ওপর থানার ভেতরেই হামলা করেছেন তারা। অন্তত পাঁচ জন পুলিশের সঙ্গে তারা মারামারিতে জড়িয়েছেন। তিন জন নারী কনস্টেবল আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।’

এ বিষয়ে এসআই পল্লব কুমার ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মারধর ও ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘সব অভিযোগ অবান্তর ও বানোয়াট।’

রেহেনা মোস্তফা ও তার মেয়ের আইনজীবী মিজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভুক্তভোগীদের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দেওয়া সাজা বাতিল করে মা-মেয়েকে খালাস দিয়েছেন। সন্ধ্যায় তারা জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান।’

মিজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, জুবাইদা ও তার মা রেহেনা পুলিশের ওপর হামলা করেছে, শারীরিকভাবে আঘাত করেছে। থানার ভেতর ঢুকে শারীরিকভাবে আঘাত করার ঘটনায় ফৌজদারি আইনে মামলা করে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে পারতো। কিন্তু সেটা না করে পুলিশের ওপর হামলা দেখিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক।’

/এমএএ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
চীনের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলে প্রদর্শিত হবে বাংলাদেশের তথ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’
চীনের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলে প্রদর্শিত হবে বাংলাদেশের তথ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’
বাবা-মেয়েসহ ইজিবাইকের ৩ যাত্রী নিহত
বাবা-মেয়েসহ ইজিবাইকের ৩ যাত্রী নিহত
‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করবে’
‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করবে’
নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানের শতবর্ষ পালনের আহ্বান ১৪ সাংস্কৃতিক সংগঠনের
নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানের শতবর্ষ পালনের আহ্বান ১৪ সাংস্কৃতিক সংগঠনের
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ