আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শুক্রবার দিনগত গভীর রাতে বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিম রেজাকে ক্যাম্পাস এলাকাতেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিপক্ষ গ্রুপের ক্যাডাররা এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহত রেজা বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক-এর অনুসারী। আর তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের ক্যাডাররা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসীমউদ্দীনের অনুসারী।
জানা গেছে, হত্যার সময় কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয় রেজার অনুসারী পলিটেকনিক ছাত্রলীগ নেতা মেকানিক্যাল সপ্তম পর্বের ছাত্র আসাদুজ্জামান ফাহিম, মেহেদী হাসান এবং ইলেক্ট্রো মেডিক্যাল সপ্তম পর্বের ছাত্র রায়হান, পূন্য, সোহাগ, রহিম ও কাওছার হোসেনকে। ফাহিম ও মেহেদীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা পাঠানো হয়েছে। বাকিরা বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
নিহত রেজাউল করিম রেজা পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ঘড়িপাশা গ্রামের মৃত আব্দুস ছত্তারের ছেলে। তিনি বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ২০০৬ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। ২০১১ সালে কম্পিউটার বিভাগ থেকে পাস করে ছাত্রলীগ নেতা রেজা অতীশ দীপংকর কলেজে বিএসসি’তে ভর্তি হন। পলিটেকনিকে ছাত্রলীগের রাজনীতি ধরে রাখার জন্য তিনি বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কাছে ভাড়া বাসায় থাকতেন।
শুক্রবার রাত ১০টার দিকে এই ঘটনার প্রতিবাদে ইনস্টিটিউটের সামনে যুবলীগের এক নেতার বাড়ি, রাস্তায় অটোরিকশা ভাঙচুর ও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে তার সমর্থকরা।
রাজ্জাকের অবর্তমানে রেজাউল করিম ছাত্রলীগের একাংশের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। এ নিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের ভেতরে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলে আসছিল। ইতোমধ্যে রেজা ও তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের সঙ্গে বেশ কয়েকবার হামলা, সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে বেশ কিছু দিন যাবত ক্যাম্পাস অশান্ত ছিল।
এ ঘটনায় শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে হামলায় অংশ নেওয়া জাহিদের বাবাসহ দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। তবে শনিবার দুপুরে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনও মামলা বা কেউ গ্রেফতার হয়নি বলে জানায় পুলিশ।
রেজা গ্রুপের সমর্থক আহত রায়হান জানান, সম্প্রতি রাতের আঁধারে নগরীর আমির কুটির এলাকার হরিজন পট্টির বাসিন্দা সন্ত্রাসী জাহিদ ধারালো অস্ত্রসহ তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। এসময় সিভিল বিভাগের ছাত্র মোর্শেদের কাছে চাঁদা দাবিসহ বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়।
তখন রেজা গ্রুপের অনুসারীরা তাকে ক্যাম্পাসের মধ্যে আটকে গণধোলাই দিয়ে একটি ধারালো অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু এক সপ্তাহ না যেতেই সন্ত্রাসী জাহিদ জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যান।
ইলেকট্রিক বিভাগের ছাত্র আশিকুর রহমান জানান, রেজাউল করিম রেজা, আসাদুজ্জামান ফাহিম, মেহেদী হাসান ও রায়হান শুক্রবার রাত ১০টার দিকে একসঙ্গে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন। তখন আগে থেকেই ক্যাম্পাস সংলগ্ন টুইন টাওয়ারের গলিতে অবস্থান নেওয়া সন্ত্রাসী জাহিদ, রাকিব ও ছাত্রলীগের অন্য অংশের নেতা পলিটেকনিকের কম্পিউটার সপ্তম সেমিস্টারের ছাত্র সাইদুল ইসলামসহ ৬/৭ জন ধারালো অস্ত্র নিয়ে রেজা ও তার সমর্থকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাদের চারজনকেই কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন।
খবর পেয়ে রেজা অনুসারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেই পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। পরে রেজাসহ আহতদের উদ্ধার করে শেবাচিম হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়।
সার্জারি ইউনিট-৪ এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. এসএম নজরুল ইসলাম জানান, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ঘাড়ের রগ কেটে যায় রেজার। এ কারণে অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশের পর পরই রাত পৌনে ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
এদিকে রেজা ও তার সমর্থকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে তার অনুসারীরা হামলাকারী সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে। এসময় তারা ক্যাম্পাস সংলগ্ন সড়কে দুটি অটোরিকশা ভাঙচুর করে। এর পরপরই ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনে থাকা মহানগর যুবলীগ সদস্য মেহেদী হাসান এর বাড়িতে ভাঙচুর চালায়।
রেজা ও তার সমর্থকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে তার অনুসারীরা হামলাকারী সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে। এসময় তারা ক্যাম্পাস সংলগ্ন সড়কে দুটি অটোরিকশা ভাঙচুর করে। এর পরপরই ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনে থাকা মহানগর যুবলীগ সদস্য মেহেদী হাসান এর বাড়িতে ভাঙচুর চালায়।
খবর পেয়ে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। এসময় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়।
মেট্রোপলিটন পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি) আজাদ রহমান জানান, রাতে রেজার মৃত্যুর সংবাদে তার অনুসারী নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে ভাঙচুর চালায়। তারা যুবলীগ নেতা মেহেদীসহ হামলাকারীদের বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করে। কোতোয়ালি থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার (ওসি) আতাউর রহমানসহ পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অভিযোগ- যুবলীগ নেতা মেহেদী হাসান বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার নির্দেশেই সন্ত্রাসীরা রেজাসহ তার সহযোগীদের কুপিয়ে জখম করে। এতে রেজার মৃত্যু হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে যুবলীগ সদস্য মেহেদী হাসান বলেন, ঘটনার সময় আমি ঘরের ভেতরে ছিলাম। ডাক চিৎকারের শব্দ পেয়ে বাইরে বের হয়ে আহতদের উদ্ধারের চেষ্টায় এগিয়ে আসি। কিন্তু উল্টো রেজার লোকজন আমাদের ঘরে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি) আজাদ রহমান জানান, পূর্ব বিরোধের জের ধরে ক্যাম্পাস এবং বহিরাগত ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ রেজা ও তার সহযোগীদের কুপিয়ে জখম করে। এ নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মেহেদী নামের যুবলীগ নেতার বাড়িতে ভাঙচুর করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও পরবর্তীতে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, রাতে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে বটতলা আমির কুটির এলাকার জাহিদের বাবাসহ দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বাউফলের বাসিন্দা রেজাউল করিম রেজা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বর্তমান জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকের হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
রাজ্জাকের অবর্তমানে রেজাউল করিম ছাত্রলীগের একাংশের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। এ নিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের ভেতরে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলে আসছিল। ইতোমধ্যে রেজা ও তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের সঙ্গে বেশ কয়েকবার হামলা, সংঘর্ষ, ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে বেশ কিছু দিন যাবত ক্যাম্পাস অশান্ত ছিল।
আরও পড়ুন-
ব্যালট ছিনতাই করে সিল মারার অভিযোগে দুজনের কারাদণ্ড
কুমিল্লায় আ.লীগ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ ৫, আহত ৪০
/এফএস / এএইচ/








