সারাদেশের মতো আগামীকাল রবিবার বরিশালেও শুরু হচ্ছে করোভাইরাস প্রতিরোধে বহুল প্রতীক্ষিত ভ্যাকসিন দেওয়ার কর্মসূচি। এখানে প্রথম দিনেই ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছেন ১ হাজার ৭৬৭ ব্যক্তি। তবে এ প্রক্রিয়া শুরু হবে জন প্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যকর্মীদের শরীরে প্রয়োগের মাধ্যমে। এরপর সম্মুখ যোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধারা পাবেন ভ্যাকসিন। তবে দেওয়া হবে কেবল এসএমএস প্রাপ্তদের। জেলার ১৩১টি বুথ থেকে একযোগে করোনা টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হবে। এ লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিটি করপোরেশন। তবে অ্যাপসের ওপরেই নির্ভরতা থাকবে না। গ্রামীণ এলাকার মানুষের সুবিধার্থে করোনার ভ্যাকসিনের প্রচার যেমন চলবে তেমনই অচিরেই গ্রামের মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে, চাইলে কেউ বুথে এসে রেজিস্ট্রেশন করেও দিতে পারবেন করোনার ভ্যাকসিন।
শহরের মানুষকে সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করার জন্য বলা হলেও গ্রামের সাধারণ মানুষ যারা কম্পিউটার চালাতে পারেন না কিংবা অ্যাপের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করতে সক্ষম নন তারা বুথে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন এ তথ্যও জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে।
এদিকে বরিশালে প্রথম করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন সিভিল সার্জন এবং শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মনোয়ার হোসেন। এছাড়াও আগ্রহ দেখিয়েছেন সাবেক অধ্যক্ষ ডা. অসীত ভূষণ দাস ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. পিযুস কান্তি দাস।
সিভিল সার্জন বলেন, টিকা নিয়ে যে অপপ্রচার রয়েছে তা বন্ধে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কেন্দ্রে তিনি প্রথমে টিকা নেওয়ার ঘোষনা দিয়েছেন। টিকায় কোনও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। তবে একটু ব্যথা, জ্বর ও শরীরে র্যাশ হতে পারে। আমরা এগিয়ে এলে সাধারণ মানুষের সংশয় দূর হবে। টিকা নিয়ে অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান সিভিল সার্জন।
ডা. অসিত ভূষণ দাস বলেন, মানবদেহে এই টিকা নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে। টিকা প্রয়োগের পর এটিকে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য মানবদেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে দেখা গেছে। টিকা শুধু ওই টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তিকেই নয়, তার আশপাশে থাকা অন্যদেরও স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয়। সবাইকে অনুরোধ করবো অনলাইনে নিবন্ধন করে যথা সময়ে টিকা নিয়ে নিরাপদ থাকতে।
ডা. পিযুস কান্তি দাস বলেন, প্রথমে টিকা নেওয়ার কারণ হলো, সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা দূর করে উদ্বুদ্ধ করা। চিকিৎসককে টিকা নিতে দেখলে সাধারণ মানুষের ভীতি ও ভুল ধারণা দূর হবে। সাথে সাথে তারা টিকা নিতে উৎসাহিত হবে।
জানা গেছে, বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে ১৭টি কেন্দ্র। যার মধ্যে শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮টি, বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে ৮টি এবং পুলিশ হাসপাতালে ১টি বুথ রয়েছে। এছাড়াও জেলার ৯ উপজেলায় রয়েছে ১১৪টি বুথ। এর মধ্যে ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩টি করে মোট ২৭টি এবং ৮৭টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে একটি করে ৮৭টি বুথ প্রস্তুত করা হয়েছে।
বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. মনোয়ার হোসেন জানান, জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ডোজ করোনার টিকা এসেছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০ হাজার ৭৯০ ডোজ, উপজেলাগুলোর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩৩ হাজার ৩৭০, আগৈলঝাড়ায় ৯ হাজার ৪৭০, বাবুগঞ্জে ৮ হাজার ৮৯০, বাকেরগঞ্জে ১৯ হাজার ৮৮০, উজিরপুরে ১৪ হাজার ৮৮০, বানারীপাড়ায় ৯ হাজার ৩৯০, মুলাদীতে ১১ হাজার ৭০, মেহেন্দিগঞ্জে ১৯ হাজার ৭০, গৌরনদীতে ১১ হাজার ৯৪০ ডোজ এবং হিজলা উপজেলার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৯ হাজার ২৫০ ডোজ টিকা।
সিভিল সার্জন আরও জানান, গ্রামের সাধারণ মানুষ যারা করোনার টিকার রেজিস্ট্রেশন করতে সক্ষম নয় তাদের রেজিস্ট্রেশন করার ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা হবে। আবার কেউ চাইলে বুথে এসেও রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন।
জেলায় টিকা প্রদানের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৭০ হাজার মানুষের তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ের পাঠানো হয়েছে। বরিশাল সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার মানুষের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া রবিবার করোনা ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য ১ হাজার ৭৬৭ ব্যক্তি নিবন্ধন করেছেন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয় জানিয়েছে, ভ্যাকসিন প্রদানের প্রতিটি টিমে ২জন উচ্চ প্রশিক্ষিত ভ্যাকসিনেটর এবং ৪ জন স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করবেন। শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪টি টিম, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ৮টি টিম, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২টি করে টিম করোনার টিকা প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া অতিরিক্ত হিসেবে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে একটি টিম স্ট্যান্ডবাই রাখা হবে। সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০টি টিম ভ্যাকসিন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকবে।
বরিশাল বিভাগে ভ্যাকসিনেটর ও স্বেচ্ছাসেবকসহ মোট ৮৮৮ জন করোনা ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এর মধ্যে ১৩২ জন ভ্যাকসিনেটর এবং স্বেচ্ছাসবেক থাকবেন ৭৫৬ জন। ১৫ ক্যাটারগরির মানুষকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা বন্টন করা হবে। এর মধ্যে সামরিক-বেসামরিক, সরকারি চাকরিজীবী, স্বাস্থ্যকর্মী, জনপ্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা, উন্নয়ন সংস্থার কর্মী এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা।
প্রসঙ্গত: ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রখ্যাত ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রজেনেকা ফার্মা উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের টিকা ‘কোভিশিল্ড’ উৎপাদনের দায়িত্ব পেয়েছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট। বেক্সিমকো ফার্মা সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বে এই টিকা কিনে এনে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী সারাদেশে বিতরণ করছে। গত ২৯ জানুয়ারি করোনার ভ্যাকসিনের প্রথম চালান এসেছে বরিশালে। প্রথম দফায় বরিশাল জেলার জন্য এসেছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ডোজ ভ্যাকসিন।









