আদালতের নির্দেশে দাফনের ৪১ দিন পর কবর থেকে মাকসুদুর রহমান তালুকদার নামে এক ব্যক্তির লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের সামনে খাল রক্ষার দাবির পর ওই ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায় শ্মশানের মধ্যে। এ ঘটনায় ১৫ সেপ্টেম্বর পৌর মেয়র মহিউদ্দিন আহমেদকে প্রধান আসামি করে ছয় জনের নাম উল্লেখ করে পটুয়াখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা করেন নিহতের ভাতিজা এনামুল হক।
মামলার অপর আসামিরা হলেন পৌরসভার কাউন্সিলর এস এম ফারুক, মেয়রের পিএস মো. এনামুল, মো. নিজাম, অপু শিকদার ও আমিুল ইসলাম মামুন। মামলায় আরও ১০-১২ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। আদালতের বিচারক মো. আশেকুর রহমান মামলাটি আমলে নিয়ে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে সিআইডিকে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৮ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে পটুয়াখালী পৌর কবরস্থান থেকে মাকসুদুর রহমানের লাশ তোলার পর পটুয়াখালী হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। বুধবার (১৯ অক্টোবর) ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট মো. কামরুল হাসান।
মাকসুদুর রহমান (৬২) পৌর শহরের কালিকাপুর এলাকার জুলফিকার আলী তালুকদারের ছেলে। মেয়রের নির্দেশে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে পরিবারের দাবি। এ ঘটনায় মামলার পর আদালতের নির্দেশে কবর থেকে লাশ উত্তোলন করেছে সিআইডি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পটুয়াখালী সিআইডির উপপরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এর আগে ৩ অক্টোবর লাশ উত্তোলন করার কথা ছিল। কিন্তু পটুয়াখালী হাসপাতালে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে কোনও চিকিৎসক না থাকায় লাশ উত্তোলন করা হয়নি। বিষয়টি পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন এস এম কবির হাসান ওই দিন লিখিতভাবে আদালতকে জানান। এরপর ৬ অক্টোবর আদালত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশের বিষয়টি ১৫ অক্টোবর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক এসএম মনিরুজ্জামান লিখিতভাবে হাসপাতালের অধ্যক্ষকে জানান। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মনিরুজ্জামান শাহীন এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন। সে অনুযায়ী মাকসুদুর রহমানের ময়নাতদন্ত সম্পূর্ণ করতে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেফায়েতুল হায়দারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
অধ্যাপক রেফায়েতুল হায়দার বলেন, লাশটি পটুয়াখালী হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। বুধবার লাশ বরিশালে এনে ময়নাতদন্ত করা হবে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী গত ৬ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী পৌরসভার সুতাখালী খাল পরিদর্শনে আসেন। এ সময় খাল রক্ষার দাবি নিয়ে এগিয়ে আসেন মাকসুদুর রহমান। চেয়ারম্যানের সামনে বৃদ্ধকে হুমকি দেন পৌরসভার মেয়র মহিউদ্দিন আহমেদসহ তার লোকজন। তখন মেয়রের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান মাকসুদুর। এর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, খাল দখলের প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে ওই দিন মাকসুদুর রহমানের ভাতিজা এনামুল হক নাসিরকে আটক করে পুলিশ। মেয়রের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ানোর ঘণ্টাখানেক পর মাকসুদুর রহমানের লাশ পাওয়া যায় সুতাখালী খালের পারের শ্মশানের ভেতরে। তারপর আটক এনামুল হক নাসিরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে মেয়রের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে মাকসুদুর রহমানের দাফনকাজ সম্পন্ন করা হয়।
মাকসুদুর রহমান তালুকদারের মেয়ে অনামিকা আক্তার বলেন, আমার বাবাকে মেয়র এবং তার লোকজন পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। এখন আমাদেরকে মামলা তুলে নিতে মেয়র মহিউদ্দিনসহ তার লোকজন বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন। আমাদেরকে পটুয়াখালী ছাড়তে বলা হয়েছে। মামলার পর বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, আমরা বাসা থেকে বের হলে মারধর করা হয়। ৫ অক্টোবর রাতে পৌর শহরের ফটিকের খেয়াঘাট এলাকায় গেলে আমার ওপর হামলা চালান মেয়রের পিএস এনামুলসহ ১৫-১৬ জনের একটি দল। এ সময় আমাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন বোন রিসতা আক্তার, মিম আক্তার ও ভাতিজা নিশাত তালুকদার। ওই দিন আমাদের মারধর করা হয়। পরে থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আমার বাবা হত্যার বিচার চাই।









