গত কয়েক বছর দাম না পাওয়ায় এবার ছাগলের চামড়া না কেনার কথা জানিয়েছেন ভোলার ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা। আকারে ছোট হওয়ায় এবং সরকার নির্ধারিত মূল্য থেকে চামড়া প্রতি খরচ বেশি হওয়ায় আগ্রহ হারিয়েছেন তারা। ইতোমধ্যে অনেকে চামড়া ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি গত তিন বছর বিক্রি করতে না পারায় এবার ছাগলের চামড়া সংগ্রহ না করার কথা জানালেন স্থানীয় মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ।
জেলার চামড়া ব্যবসায়ী, আড়তদার ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ঈদুল আজহায় প্রচুর ছাগলের চামড়া সংগ্রহ ও কিনেছেন তারা। কিন্তু একটি চামড়াও বিক্রি করতে পারেননি। ফলে লোকসান গুনতে হয়েছে তাদের। এ জন্য আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।
তারা বলছেন, ছাগলের একটি চামড়ার পেছনে তিন-চার কেজি লবণ লাগে। এবার লবণের দাম গতবারের চেয়ে দ্বিগুণ। লবণে খরচ হয় ৫০-৬০ টাকা। এর সঙ্গে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে আরও ৬০ টাকা খরচ হয়। এই হিসাবে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে খরচ বেশি পড়ে। কারণ গত বছর সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছিল প্রতি বর্গফুট ১৮-২০ টাকা। এটি কোনোভাবেই খরচের সঙ্গে যায় না।
৪০ বছরের বেশি সময় ধরে চামড়া ব্যবসায় জড়িত ভোলার মুন্না করপোরেশনের মালিক মো. ইলিয়াছ। শুধুমাত্র ঐতিহ্যের কারণে ব্যবসা ধরে রেখেছেন। তার মতে, জেলায় এখন চামড়া ব্যবসার শেষ সময় চলছে।
একটি গরুর চামড়া ১৫-১৭ বর্গফুট হয় জানিয়ে আড়তদার মো. ইলিয়াছ বলেন, ‘ধরেন এটি কেনা হয় ২০০-২৫০ টাকায়। কেনার পর সংরক্ষণে ১২-১৫ কেজি লবণ লাগে। সেইসঙ্গে শ্রমিকের মজুরি। সবমিলে খরচ দাঁড়ায় ৫০০-৬০০ টাকা। প্রক্রিয়াজাত করা এই চামড়া ঢাকার পোস্তগোলা আড়তে নেওয়ার পর খরচ বাদে ১০০ টাকাও লাভ পাওয়া যায় না। উল্টো যাতায়াত ভাড়াসহ লোকসান গুনতে হয়।’
লোকসানের কারণ জানতে চাইলে জেলার সবচেয়ে বড় এই আড়তদার বলেন, ‘ভোলায় প্রতি বছর বেশিরভাগই গাভি কোরবানি দেওয়া হয়। এর মধ্যে অধিকাংশ বাছুর দেয় না। আবার নানা সমস্যাজনিত কারণে মালিকরা এগুলো বিক্রি করে দেন। গাভির চামড়া পাতলা, তাই চাহিদা ও দাম কম। ষাঁড় গরুর চামড়া মোটা, চাহিদা এবং দাম ভালো পাওয়া যায়। উত্তরবঙ্গে বেশিরভাগ ষাঁড় কোরবানি দেওয়া হয়।’
ছাগলের চামড়া না কেনার কারণ জানতে চাইলে আড়তদার মো. ইলিয়াছ বলেন, ‘ছাগলের একটি চামড়ার পেছনে তিন-চার কেজি লবণ লাগে। এবার লবণের দাম দ্বিগুণ। লবণে খরচ হয় ৫০-৬০ টাকা। এর সঙ্গে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে আরও ৬০ টাকা খরচ হয়। এই হিসাবে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে খরচ বেশি পড়ে সংরক্ষণে। ফলে ছাগলের চামড়া কিনে লোকসান দেওয়ার কোনও মানে নেই।’
ইলিয়াছের মতো একই কথা জানিয়েছেন জেলার চামড়া ব্যবসায়ী কামাল হোসেন, রুবেল মিয়া ও মিজানুর রহমান। তারা জানান, একটি ছাগলের চামড়া সংরক্ষণে তিন-চার কেজি লবণ লাগে। শ্রমিক মজুরি দিয়ে ওই চামড়া ঢাকার আড়তে নিয়ে বিক্রি করা যায় না। তাই এবার ছাগলের চামড়া কিনবেন না তারা।
কামাল হোসেন বলেন, ‘ঢাকার আড়তদারদের কাছে জেলার ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা পাবেন। বকেয়া টাকা না পেয়ে অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা ছেড়ে চলে গেছেন। আড়তদারদের বকেয়া পরিশোধের জন্য চাপ দিলে তারা বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে কোটি কোটি টাকা পাওনা রয়েছেন।
এবার ছাগলের চামড়া সংগ্রহ করবেন না বলে জানিয়েছেন জেলার পরাণগঞ্জ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, ‘গত তিন বছর চামড়া সংগ্রহ করলেও বিক্রি করতে পারিনি। উল্টো প্রক্রিয়াজাত করে লোকসান দিতে হয়েছে। এ জন্য এবার সংগ্রহ করবো না।’
একই কথা বলেছেন ইলিশা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আবদুল খালেক। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর চামড়া সংগ্রহ করে অনেক টাকা লোকসান দিতে হয়েছে। একসময় মাদ্রাসার আয়ের অন্যতম খাত ছিল কোরবানির চামড়া। এখন সেটি শূন্য। তবে যারা বিনামূল্যে গরুর চামড়া দান করবেন, তা সংগ্রহ করবো।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ কুমার মন্ডল বলেন, ‘ভোলায় এবার কোরবানিতে পশুর চাহিদা রয়েছে ৮৪ হাজার ৪০০টির। এর বিপরীতে রয়েছে ৯০ হাজার।’
পশুর চামড়া বিক্রি ও সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলার চামড়া ব্যবসায়ীরা নিজেদের উদ্যোগে চামড়া কিনবেন এবং সংরক্ষণ করবেন। বর্তমান বাজার অনুযায়ী সরকার চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেবে।’









