X
বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪
৪ বৈশাখ ১৪৩১

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা রোধে চালু হচ্ছে কাউন্সেলিং দফতর

সালেহ টিটু, বরিশাল
২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:০১আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:১৯

মৃত্যু, যেখান থেকে ফেরা যায় না। এই বাস্তবতা জানার পরও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) থেকে শুরু করে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাণ ঝরছে শিক্ষার্থীদের। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে রক্ষার এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেয়নি কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার পর কাউন্সেলিং দফতর খোলার কথা জানালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। পাশাপাশি আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে রক্ষায় রাষ্ট্রকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তারা হলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বৃষ্টি সরকার, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শাহরিন রিভানা ও গণিতের সুপ্রিয়া দাস। একই সময়ের মধ্যে ১১ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলে দুজন, শের-ই-বাংলা হলে তিন জন, শেখ হাসিনা হলে একজন, মেসে চার জন এবং নিজ বাসায় এক ছাত্র আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। সর্বশেষ গত ১৭ জানুয়ারি রাতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ৮ম ব্যাচের বৃষ্টি সরকার মেসে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন।

সহপাঠীরা জানিয়েছেন, মৃত্যুর আগের বৃষ্টির সঙ্গে প্রেমিকের মনোমালিন্য চলছিল। ওই ঘটনার জের ধরে মেসে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেছেন। বৃষ্টি সাতক্ষীরার বাসিন্দা। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ নিজ বাড়িতে নিয়ে দাহ করা হয়। এ ঘটনায় বন্দর থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

২০২৩ সালের ২০ জুলাই বরিশালে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন কর্নকাঠি আনন্দবাজার এলাকার মোল্লা ছাত্রীনিবাস থেকে উদ্ধার করা হয় উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ছাত্রী শাহরিন রিভানার লাশ। তিনি পিরোজপুরের সোহাগদল এলাকার আলতাফ মাসুম ইসলাম শাহীনের মেয়ে। সহপাঠীরা জানিয়েছেন, ১৬ জুলাই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন রিভানা। এরপর থেকে খোঁজ পায়নি পরিবার। ২০ জুলাই রাতে ছাত্রীর মা মেয়ের সন্ধানে আসেন। ছাত্রীনিবাসের কক্ষ খুলে মেয়েকে ফ্যানে ঝুলতে দেখেন। একাকিত্ব থেকে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে পুলিশের ধারণা।

২০২০ সালের ২ আগস্ট ফরিদপুরের নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন সুপ্রিয়া দাস। তিনি গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। সহপাঠীরা জানিয়েছেন, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তপু মজুমদারের সঙ্গে সুপ্রিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ওই বছরের ১৪ জুন রাতে দুই জনের কথা কাটাকাটি ও ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে সুপ্রিয়া কান্নাকাটি করে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে উঠে মোবাইলে অনেকগুলো মেসেজ দেখেন। তাৎক্ষণিক কল করে জানতে পারেন প্রেমিক আত্মহত্যা করেছেন। এরপর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তপুর আত্মহত্যার ঘটনায় সামাজিকভাবে তাকে দোষারোপসহ নানা ভাবে কটূক্তি করা হয়। তপু ঝালকাঠির বাসিন্দা। তার মৃত্যুর দেড় মাস পর সুপ্রিয়াও আত্মহত্যা করেন।

আত্মহত্যা রোধে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দরকার উল্লেখ করে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুজয় শুভ বলেন, ‘আমাদের সংগঠন থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন কাউন্সিলিং সাইকোলজিস্ট নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু প্রশাসন আমলে নেয়নি। এখন সময় এসেছে দ্রুত সময়ের মধ্যে সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়ার। শিক্ষার্থীরা কোথায় পাবেন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সেজন্য প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সিলিং দফতর খোলা জরুরি।’

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

তিনি বলেন, ‘বছরব্যাপী সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং ক্রীড়াসহ নানা আয়োজন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। সেইসঙ্গে ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শ কেন্দ্র আরও সক্রিয় করার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক-শারীরিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।’

আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে রক্ষায় কোনও শিক্ষার্থীকে একা থাকতে দেওয়া হবে না, একা থাকা উচিত নয় বলে উল্লেখ করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (রুটিন দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘তাদের সঙ্গে পরিবার থেকে শুরু করে সহপাঠী, বন্ধু এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। কারও কোনও সমস্যা হলে কিংবা দেখলে আমাদের জানানোর আহ্বান জানাই শিক্ষার্থীদের। সেইসঙ্গে ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শ কেন্দ্র আরও সক্রিয় করা হবে। আর যাতে একটি প্রাণও না ঝরে সেজন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সিলিং দফতর চালু করা হবে। এতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে।’

শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, নগরীর এবং জেলার ১০ উপজেলার এমন কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে না যেখানে একজন শিক্ষার্থীও আত্মহত্যা করেনি এমনটি জানালেন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক মহসিন উল ইসলাম হাবুল। তিনি বলেন, ‘নগরীর সরকারি বিএম কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, অমৃত লাল দে কলেজ, সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বিএম স্কুল ও টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। অথচ শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কোনও উদ্যোগ নেয়নি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দিন যত গড়াচ্ছে আত্মহত্যার ঘটনা ততই বাড়ছে। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করলেও সরকারিভাবে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আত্মহত্যা থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে এগিয়ে আসতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে গবেষণা করে বের করতে হবে, কী কী করলে, কোন ধরনের পদক্ষেপ নিলে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা থেকে রক্ষা সম্ভব। সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। না হয় এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’

/এএম/
সম্পর্কিত
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
মাদারীপুরে বজ্রাঘাতে ২ জনের মৃত্যু
খাবার না খাওয়ায় বাবার ‘চড়’, মাথায় আঘাত পেয়ে শিশুর মৃত্যু
সর্বশেষ খবর
সেমিতে সেই পিএসজি, আরও ভালোভাবে প্রস্তুত ডর্টমুন্ড
সেমিতে সেই পিএসজি, আরও ভালোভাবে প্রস্তুত ডর্টমুন্ড
দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে স্বামী-স্ত্রী নিহত
দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে স্বামী-স্ত্রী নিহত
ছেলের হাতে মা খুনের অভিযোগ
ছেলের হাতে মা খুনের অভিযোগ
এতই বিকট শব্দ আসছে মনে হচ্ছে, বাড়ির পাশে যুদ্ধ চলছে
এতই বিকট শব্দ আসছে মনে হচ্ছে, বাড়ির পাশে যুদ্ধ চলছে
সর্বাধিক পঠিত
ডিপ্লোমাধারীদের বিএসসির মর্যাদা দিতে কমিটি
ডিপ্লোমাধারীদের বিএসসির মর্যাদা দিতে কমিটি
উৎসব থমকে যাচ্ছে ‘রূপান্তর’ বিতর্কে, কিন্তু কেন
উৎসব থমকে যাচ্ছে ‘রূপান্তর’ বিতর্কে, কিন্তু কেন
চুরি ও ভেজাল প্রতিরোধে ট্যাংক লরিতে নতুন ব্যবস্থা আসছে
চুরি ও ভেজাল প্রতিরোধে ট্যাংক লরিতে নতুন ব্যবস্থা আসছে
রুশ হামলা ঠেকানোর ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে গেছে: জেলেনস্কি
রুশ হামলা ঠেকানোর ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে গেছে: জেলেনস্কি
আপনি কি টক্সিক প্যারেন্ট? বুঝে নিন এই ৫ লক্ষণে
আপনি কি টক্সিক প্যারেন্ট? বুঝে নিন এই ৫ লক্ষণে