সরকারি হাসপাতালে পেটেভাতে কাজ করা ২০০ কর্মীকে একসঙ্গে ‘ছাঁটাই’

সালেহ টিটু, বরিশাল 
১০ জুন ২০২৬, ১৯:২১আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ১৯:২১

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পেটেভাতে কাজ করে আসছিলেন দুই শতাধিক কর্মী। দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের হয়রানি, ট্রলি ভাড়া দিয়ে টাকা আদায়, রোগী ভাগিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়াসহ নানা অভিযোগে কয়েকদিন আগে ২০০ কর্মীকে একসঙ্গে ‘ছাঁটাই’ করে দিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক। এ নিয়ে চাপে পড়েছেন তিনি। ওসব কর্মীকে ফেরাতে একটি পক্ষ চাপ তৈরি করছে।

হাসপাতালের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেটেভাতে কাজ করা এসব কর্মী দালাল হিসেবে কাজ করে আসছেন বছরের পর বছর। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই রোগীদের। এসব কর্মী নিয়োগ দেন তৃতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণির শতাধিক কর্মচারী এবং ওয়ার্ড মাস্টার ও কিছু নার্স। এজন্য যারা নিয়োগ দেন তাদের মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। আবার মাসোয়ারাও দিতে হয়। এসব কর্মী নিয়োগ পেয়ে হাসপাতালে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। বিশেষ করে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালি হয়ে ওঠে তাদের প্রধান পেশা। ট্রলি ভাড়া দিয়ে টাকা আদায় করেন। এমনকি যারা তাদের নিয়োগ দেন ওসব কর্মচারী কোনও কাজ না করে বেতন-ভাতা তোলেন। এদের কাছ থেকে টাকা নেন। এগুলো হাসপাতালের বদনাম করছে।

প্রথমবারের মতো ওসব কর্মীকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন তাদের নিয়োগদাতারা। তারা তাদের ফিরিয়ে আনতে এখন কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছেন। এমনকি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের নিয়ে পরিচালকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতেছেন। তাদের আবার হাসপাতালে কাজ করতে দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে পরিচালককে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

পেটেভাতের কর্মী বেল্লাল হোসেন ও সুমিতা আক্তার জানান, তারা হাসপাতালে কাজ করার জন্য তৃতীয় শ্রেণির এক কর্মচারীকে ৫০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। একইসঙ্গে রোগীদের কাছ থেকে যে টাকা আয় হয়, তার একটা অংশ প্রতি মাসে ওই কর্মচারীকে দিতে হয়। তাদের বের করে দেওয়ায় কাজ হারিয়ে এখন সমস্যায় পড়েছেন। অথচ যে সময় তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছিল ওই কর্মচারী বলেছেন, কখনও কোনও সমস্যা হবে না। তারা প্রতিদিন কাজ করতে পারবেন এবং রোগীদের কাছ থেকে টাকাও আয় করতে পারবেন। 

বেল্লাল হোসেন বলেন, ‌‘প্রতিদিন রোগীদের বিভিন্ন কাজ করে দেওয়ায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হতো। মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় হয়। এ ছাড়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠালে তারও একটা অংশ পেতাম। এক পরিবারের দুজন এই কাজে থাকতে পারলে আয় আরও বেশি হয়। এখন সেটি বন্ধ। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অথবা রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে সুপারিশ করিয়ে এই কাজ মেলে। তবে এসব বিষয়ে পরিচালক অথবা সহকারী পরিচালক কিছুই জানেন না।’

কয়েকদিন আগে শেবাচিম হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে কয়েকজন দালালকে আটক করেছিল র‌্যাব

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও দুজন কর্মী জানান, এখানে কাজ করলে হাসপাতালের খাবার থেকে শুরু করে ওষুধ এবং আত্মীয়-স্বজনের চিকিৎসা, নিজেদের চিকিৎসা সবই ফ্রিতে করার সুযোগ পাওয়া যায়। অনেক চিকিৎসক তাদের চেনেন না, তারা জানেন বেতনভুক্ত কর্মচারী। এটা নিশ্চিত করে যাদের মাধ্যমে কাজে যোগ দেন, তারাই বিভিন্ন ওয়ার্ডে তাদের কাজ করার সুযোগ করে দেন। ওয়ার্ড মাস্টার, সিনিয়র নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নেতা তাদের পক্ষে থাকায় বছরের পর বছর কোনও সমস্যায় পড়তে হয়নি। 

তারা জানান, প্রথমবার পেটেভাতের কর্মীদের খুঁজে খুঁজে বের করে দেওয়া হয়েছে। অন্তত ২০০ কর্মী ছিলেন বিভিন্ন ওয়ার্ডে। আরও অনেকের টাকা দেওয়া আছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কাছে। 

হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেটেভাতে যারা কাজ করছিলেন তারা রোগীদের বিভিন্ন জিনিস চুরি থেকে শুরু করে ওষুধ, খাবার, বেড-কাভার এমন কিছু নেই যা তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতো। সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হতো রোগীদের, জোরপূর্বক তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন তারা। এমনকি নবজাতক হলে রোগীর কাছ থেকে টাকা আদায় করার একাধিক অভিযোগ আছে। রোগীরা কোনোভাবেই বুঝতেন না এরা হাসপাতালের নিয়মিত কর্মচারী নন। এদের সিন্ডিকেট এত শক্তিশালী তাদের বিরুদ্ধে কেউ শব্দ পর্যন্ত করতে পারতো না। বিভিন্ন সময় চোরাই মালামালসহ তারা আটক হলেও সিন্ডিকেটের সদস্যরা ছাড়িয়ে আনতেন। তাদের বের করে দেওয়ায় রোগীসহ সবাই খুশি হয়েছেন।

প্রশাসনিক দফতর সূত্রে জানা গেছে, ৪০০-এর অধিক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সিন্ডিকেটের কাছে ইতিপূর্বে যারাই পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা অসহায় ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে গেলে কর্মবিরতির ডাকসহ হাসপাতালে নৈরাজ্য সৃষ্টি করায় এ ধরনের পদক্ষেপ কোনও পরিচালক নেননি। এমনকি পরিচালকের হস্তক্ষেপে র‌্যাব-পুলিশের যৌথ অভিযানে কিছু দালাল ধরা পড়লেও তারা আবার আদালত থেকে বের হয়ে একই কাজে জড়িয়ে পড়েন। রোগী ও হাসপাতালের সুনামের কথা ভেবে তাদের ছাঁটাই করা হয়।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আবদুল মুনায়েম সাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই অনিবন্ধিত (পেটেভাতের) কর্মীরা কীভাবে বছরের পর বছর হাসপাতালে কাজ করেছেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আমরা জেনেছি, হাসপাতাল ৫০০ থেকে ১০০০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর থেকেই তারা বিভিন্নভাবে এখানে কাজ করে আসছিলেন। কিন্তু কোনও নিয়োগ প্রক্রিয়া ছাড়া এ ধরনের ব্যবস্থা অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে।’

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু পেটের দায়ে কাজ করছে—এমন যুক্তি দিয়ে বছরের পর বছর একটি অনিয়মিত ব্যবস্থা চলতে পারে না। আমরা এই ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে চাই। যে কারণে অনেক চাপও সৃষ্টি হচ্ছে। এ চাপ মোকাবিলা করতে হলে রোগী, তাদের স্বজন ও সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।’

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৫০০ শয্যার লোকবল নিয়ে সাজানো ব্যাবস্থাপনায় চলছে ১০০০ শয্যার এই হাসপাতাল। রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে পেটেভাতের কর্মীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের হয়রানি, ট্রলি ভাড়া দিয়ে টাকা আদায়, রোগী ভাগিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়াসহ নানা অভিযোগের শেষ ছিল না। পুরো হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছি। শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং রোগীদের হয়রানি কমাতে তাদের ‘ছাঁটাই’ করা হয়েছে। রোগীদের ভোগান্তি বাড়ানো ছাড়া এসব পেটেভাতের কর্মীর হাসপাতালে কোনও কাজ নেই।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
ডেঙ্গু নিয়ে আরও ৭৩ জন হাসপাতালে ভর্তি
২৮৫ কোটি টাকার ১৫০ শয্যার হাসপাতালটি কবে চালু হবে?
চট্টগ্রামে হামের ‘হটস্পট’ ৯ ওয়ার্ড, হাসপাতালে জায়গা নেই
সর্বশেষ খবর
মমতার তৃণমূল কি কংগ্রেসে বিলীন হচ্ছে?
মমতার তৃণমূল কি কংগ্রেসে বিলীন হচ্ছে?
ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ অ্যালবাম: ইলেকট্রো-পপ আর পানসে হিপ-হপ টিউনসের এক জগাখিচুড়ি
রিভিউফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ অ্যালবাম: ইলেকট্রো-পপ আর পানসে হিপ-হপ টিউনসের এক জগাখিচুড়ি
‘ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী কেন নাটোরে বিয়ে করেন নাই, এমন প্রশ্ন করবেন না’ 
‘ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদ্যুৎমন্ত্রী কেন নাটোরে বিয়ে করেন নাই, এমন প্রশ্ন করবেন না’ 
এবার লাইভ করতে করতে থানায় আশ্রয় নিলেন সেই মাহদী
এবার লাইভ করতে করতে থানায় আশ্রয় নিলেন সেই মাহদী
সর্বাধিক পঠিত
একসময় আমদানিনির্ভর রেলের ১৬০ ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে এক উপজেলাতেই
একসময় আমদানিনির্ভর রেলের ১৬০ ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে এক উপজেলাতেই
যে যুক্তিতে খালাস পেলেন নাসির-তামিমা
যে যুক্তিতে খালাস পেলেন নাসির-তামিমা
সচিবালয়ে টেলিফোন তার চুরির পর এবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ল্যাপটপ চুরি
সচিবালয়ে টেলিফোন তার চুরির পর এবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ল্যাপটপ চুরি
বাজেটের আগে স্বর্ণের ভরিতে কমলো ৬ হাজার ৫৯১ টাকা
বাজেটের আগে স্বর্ণের ভরিতে কমলো ৬ হাজার ৫৯১ টাকা
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ঘুরে দাঁড়ালো শেয়ারবাজার
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ঘুরে দাঁড়ালো শেয়ারবাজার