এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না দোকানে, বেশি দামে মিলছে ডিলারের কাছে

সালেহ টিটু, বরিশাল প্রতিনিধি
০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৮

বরিশাল নগরীর নিউ সার্কুলার রোড এলাকার বাসিন্দা সাদেক শুক্রবার (২ অক্টোবর) সকালে রিকশায় খালি সিলিন্ডার নিয়ে আসেন বটতলা বাজারে। এরপর দোকানের সামনে রেখে নরম সুরে একটি গ্যাস সিলিন্ডার দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। দোকানি তার কথায় তেমন ভ্রুক্ষেপ না করে সাফ জানিয়ে দেন, গ্যাস নেই। সাদেক তখন অনুরোধের সঙ্গে জানান, ভাই, একটা গ্যাস দিতেই হবে, না হলে আজকে রান্না হবে না।

দোকানদার তখন বলেন, আমার কাছে গ্যাস না থাকলে দেবো কীভাবে? আরও তো দোকান আছে, আপনি দেখেন তাদের কাছে আছে কি না।

এরপর প্রায় আধা ঘণ্টা দোকানির কাছে একটি গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য অনুরোধ করেন সাদেক। কিন্তু তাতে মন গলেনি দোকানির। তিনি অন্য ক্রেতাদের কাছে মালামাল বিক্রিতে ব্যস্ত ছিলেন।

সাদেক ওই দোকানের সামনে সিলিন্ডার রেখে অন্য দোকানে যান। চার থেকে পাঁচটি দোকান ঘুরেও তিনি গ্যাস সিলিন্ডার ম্যানেজ করতে পারেননি। পরে সাদেক দোকানি সুমনকে বলেন, এখন উপায় কী?

সুমন কিছুটা নরম সুরে বলেন, গত দুই মাস ধরে ঠিকমতো গ্যাস সিলিন্ডার পাচ্ছি না। মাঝে মাঝে দুই-একটি কোম্পানি একটি-দুটি করে গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে যায়। দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতারা তা নিয়ে যায়।

কোনোভাবে একটি সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ জানালে দোকানদার ডিলারের ম্যানেজারের কাছে ফোন করে একটি সিলিন্ডার দেওয়ার কথা জানান। একইসঙ্গে বলেন, দাম যা বলবেন তাই দেবেন।

কিছু সময় কথা বলে মোবাইলটি কেটে দেন অপর প্রান্তে থাকা ডিলারের লোক। এতে দোকানের সামনে গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন সাদেক।

১৫ থেকে ২০ মিনিট পর সাদেক দোকানিকে বলেন, ভাই, আরেকবার মোবাইল করবেন নাকি? উত্তর আসে, মোবাইল করা লাগবে না, সে নিজে থেকেই কল করবে। কারণ সিলিন্ডারের কমপক্ষে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আপনাকে বেশি দিতে হবে। আর ওই টাকাটা পাবে ওই ডিলারের লোক। এখানে আপনি-আমি যে কথা বললাম, আমার মোবাইল খরচ হলো শুধুমাত্র সম্পর্কের জন্য। এরই মধ্যে কল আসে। জানানো হয়, ১ হাজার ৮০০ টাকা দিতে হবে। সাদেক বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে বলেন, তাই পাঠাতে বলেন।

২০ মিনিটের মধ্যেই একটি রিকশাযোগে গ্যাস সিলিন্ডার চলে আসে সুমনের দোকানে। সিলিন্ডার নামিয়ে রিকশাচালক ভাড়াসহ ১ হাজার ৮০০ টাকা দিতে বলেন। সুমন ক্রেতা সাদেকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাকে গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে দেন। আর খালি সিলিন্ডার রিকশাচালক তার রিকশায় তুলে নেন।

এই কথোপকথনের মধ্যে দোকানি সুমনের মোবাইলে কল আসে এক ক্রেতার। সুমনের কথায় বোঝা যাচ্ছিল, তিনিও একটি গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছেন।

এবার সুমন নরম সুরে তাকে বুঝিয়ে বলেন, ভাই, আমার কাছে কোনও গ্যাস সিলিন্ডার নেই। তারপরও আমি বিভিন্ন দোকানে খুঁজে দেখছি। পেলে আপনাকে জানাব।

এ সময় দোকানি সুমন নিজ থেকেই বলছিলেন, মাসিক ক্রেতাকে যেভাবেই হোক একটি গ্যাস সিলিন্ডার ম্যানেজ করে দিতে হবে। একটি দোকানের নাম বলে কর্মচারীকে সেই দোকানে গিয়ে সিলিন্ডার চাওয়ার জন্য বলেন।

কিছুক্ষণ পর কর্মচারী এসে দোকানিকে জানান, সেখানেও সিলিন্ডার নেই। এরপর আবার মোবাইল তুলে ডিলারের লোকদের কাছে ফোন দেন সুমন। এবার আর অপর প্রান্ত থেকে ইতিবাচক কোনও উত্তর পাননি তিনি। এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, আপনাদের গ্যাস আর দোকানে উঠাবো না।

সুমনের ফোন কাটা দেখে মনে হয়, এ কথায় ডিলারের লোক খুশি হয়েছেন। এভাবে চার থেকে পাঁচ জন ডিলারের লোককে ফোন দেওয়ার পর একটি সিলিন্ডার ম্যানেজ করতে পারেন।

এ ধরনের ঘটনা শুধু বটতলা বাজারের খুচরা গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে নয়, প্রতিটি খুচরা গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রেতার কাছেই একইভাবে অনুনয়-বিনয় ও অনুরোধ করে গ্যাস সিলিন্ডার চাইছেন ক্রেতারা। এরপরও এলপিজি মিলছে না। পেতে হলে অতিরিক্ত দাম দিতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বরিশালের ক্রেতারা।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন যাদের বাসায় গ্যাসের বিকল্প কোনও জ্বালানির ব্যবস্থা নেই। তাদের বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। 
এদিকে গ্যাসের কারণে বিশেষ করে যারা ভাসমান ব্যবসায়ী, বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করে বিক্রি করেন, তারা পড়েছেন বড় সমস্যায়। গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য তিন-চারটি বাজার ঘুরে এরপর সিলিন্ডার ম্যানেজ করতে হচ্ছে।

সদর রোডের চা দোকানি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গ্যাস না থাকলে দোকান একেবারে বন্ধ। আর একদিন দোকান বন্ধ হলে সংসার চালানো সম্ভব হবে না। এ কারণে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে বড় বাজার থেকে একটি গ্যাস সিলিন্ডার সংগ্রহ করেছি। একই কথা জানান নগরীর আমতলা এলাকার একাধিক ভাসমান ব্যবসায়ী।

বাংলাবাজারের মুদি দোকানি মোহাম্মদ আজিম বলেন, প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ জন ক্রেতা আসেন সিলিন্ডার নেওয়ার জন্য। কিন্তু গ্যাস সিলিন্ডার না থাকায় তাদের ফেরত দিতে হয়। যাদের কাছে মোবাইল নম্বর রয়েছে, তারা কল করে গ্যাসের জন্য অনুরোধ জানান।

তিনি বলেন, গত সাত দিনে তিনটি গ্যাস সিলিন্ডার পেয়েছি। একাধিক ডিলারের কাছে ফোন করেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু বেশি দাম দিলে আবার তাদের মাধ্যমেই সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে।

একাধিক খুচরা বিক্রেতা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে ওমেরা, যমুনা, বসুন্ধরা, আই গ্যাস, নাভানা, ফ্রেশ, ইউনিক, বেক্সিমকো ও পেট্রোম্যাক্সের ডিলাররা ঠিকমতো গ্যাস সরবরাহ করছেন না। তবে মাঝেমধ্যে কিছু কোম্পানি দুই-একটি করে গ্যাস দিচ্ছে খুচরা বিক্রেতাদের।

/আরএইচ/এফআর/
সম্পর্কিত
পেট্রোবাংলা বলছে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে, ভোক্তারা বলছেন, ‘কিছুটা’
কমলো এলপিজির দাম
গ্যাস নেই, শিল্প খাত‌ চলছে কীভাবে  
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং নেতাসহ একরাতে আটক ৩৬৩
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং নেতাসহ একরাতে আটক ৩৬৩
এমন সংস্কৃতি তৈরি করবো, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের সেবা করবে: প্রধানমন্ত্রী
এমন সংস্কৃতি তৈরি করবো, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের সেবা করবে: প্রধানমন্ত্রী
রাজধানী‌তে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪০২, অস্ত্র-মাদক উদ্ধার
রাজধানী‌তে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪০২, অস্ত্র-মাদক উদ্ধার
বাংলাদেশিদের জন্য কাছেই পাহাড়-নদীর নিরিবিলি ঠিকানা, ঘুরে আসুন তুরিবাড়ি
বাংলাদেশিদের জন্য কাছেই পাহাড়-নদীর নিরিবিলি ঠিকানা, ঘুরে আসুন তুরিবাড়ি
সর্বাধিক পঠিত
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
ব্র্যাকের পর নতুন যাত্রায় মিথিলা
ব্র্যাকের পর নতুন যাত্রায় মিথিলা
ভারতের পর পাকিস্তানি নায়িকা শাকিবের!
ভারতের পর পাকিস্তানি নায়িকা শাকিবের!
প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের জানাজায় আ.লীগ নেতা, বললেন ‘ক্ষমাও চাইতে পারিনি’
প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের জানাজায় আ.লীগ নেতা, বললেন ‘ক্ষমাও চাইতে পারিনি’
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেফতার
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেফতার