মকবুলের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা হত্যার লিখিত অভিযোগ

রফিকুল ইসলাম, ফেনী
১৫ নভেম্বর ২০১৬, ০১:০৮আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৬, ০১:০৯

মকবুল আহমাদ জামায়াতে ইসলামীর আমির মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে একাত্তরে ফেনীর এক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার লিখিত অভিযোগ করেছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। গত ২৩ অক্টোবর ফেনীর দাগনভূঞার খুশিপুর গ্রামের ওই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্যাহের স্ত্রী ছালেহা বেগম ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে এই লিখিত অভিযোগ দেন।
স্বামী মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহকে অপহরণ, খুন ও লাশ গুম করার অভিযোগ এনে মকবুল আহমাদের দ্রুত বিচার দাবি করেন তিনি। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহর একমাত্র সন্তান ইয়াসিন মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে এর সত্যতা নিশ্চিত করেন।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ইয়াসিন মিয়া তার মা ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে উপস্থাপিত আবেদনে দেওয়া বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ৮টার সময় ভারত হইতে গেরিলা গ্রুপের সহিত আমার বাবা স্থানীয় সিন্দুরপুর ক্যাম্পে আসেন। ওই রাত আনুমানিক ১০টার সময় তিনি তার ব্যবহৃত রাইফেল ও পোশাক পরিহিত অবস্থায় সাত মাসের একমাত্র শিশু সন্তান হিসাবে আমাকে দেখতে আসেন। আমাকে বুকে নিয়ে দাদার কাছে কান্নাভরা কণ্ঠে বলেন, আমি রাতের মধ্যেই চলে যাব। শুধু আপনাদেরকে একনজর দেখতে এলাম।

ইয়াসিন মিয়া বলেন, ‘এসময় আমাদের ঘরের বেড়ার কাছে ওৎ পেতে থাকা শান্তি কমিটির জনৈক ব্যক্তি আমার বাবার উপস্থিতির খবর মুহূর্তের মধ্যে নিকটস্থ বাড়ির শান্তি কমিটির নেতা মকবুল আহাম্মদের কাছে পৌঁছে দেয়। এরপর পরই মকবুল আহমাদ স্থানীয় গজারিয়া তজু চেয়ারম্যানের বাড়ির রাজাকার ক্যাম্পে থাকা শর্শদীর বাসিন্দা আ. লতিফ মাওলানাকে নির্দেশ দেন পর্যাপ্ত পরিমাণ ফোর্স নিয়ে আহসান উল্যাহকে (আমার বাবাকে) ধরে নিয়ে আসতে।
ইয়াসিন মিয়া জানান, এরপর রাত আনুমানিক ১২ টার সময় রাজাকারের দল আমাদের ঘরের দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে প্রথমে আমার বৃদ্ধ দাদাকে হাত ও চোখ বেঁধে রাইফেল দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে এবং আমার মাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসময় আমার চিৎকারে ধানের গোলার মধ্যে আত্মগোপনে থাকা বাবা রাজাকারদের উদ্দেশ করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়েন। ঘটনাস্থলে দু’জন রাজাকার গুলিবিদ্ধ হয়। এর পরপরই চর্তুদিক থেকে আক্রমন চালায় রাজাকারেরা। একপর্যায়ে রাজাকাররা আমার বাবাকে রাইফেলসহ ধরে ফেলে। শুধু আমার মা, দাদা, দাদুর আহাজারির কারণে তাকে বাড়িতে না মেরে হাত আর চোখ বেঁধে সিলোনিয়া রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যায়। রাজাকারের রাত আনুমানিক ৪টার দিকে সিলোনিয়া সেতুর ওপর গুলি করে তার লাশ নদীতে ফেলে দেয়। এরপর অনেক খোঁজ করেও বাবার লাশ পাওয়া যায়নি।’

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্যাহর ষাটোর্ধ্ব স্ত্রী ছালেহা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তার স্বামী স্বাধীনতা যুদ্ধে একজন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত আনছার সদস্য ছিলেন। যুদ্ধের শুরুতে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে ফেনীর সিও অফিস এলাকা সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। ৭১ সালের জানুয়ারি মাসে তার পুত্র ইয়াসিন জন্ম গ্রহন করে। ৭১’ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে পাক বাহিনী কর্তৃক ফেনী আক্রান্ত হলে ফেনীর আওয়ামী লীগের নেতা খাজা আহাম্মদ সাহেবের নেতৃত্বে তাঁর স্বামীসহ সমস্ত মুক্তিযোদ্ধা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থান নেন।’

শহীদ পরিবারের অভিযোগ

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী ছালেহা বেগম বলেন, ‘মে মাসের মাঝামাঝি ফেনী সিলোনিয়া বাজারে ও দাগনভূঞায় তৎকালীন শান্তি বাহিনীর ও বর্তমানে জামায়াতের আমির মকবুল আহামদ, পিতা মৃত নাদরের জামান, গ্রাম- ওমরাবাদ, গজারিয়া এর নেতৃত্বে ও প্রত্যক্ষ মদদে সমগ্র ফেনী মহকুমায় রাজাকার/বদর বাহিনী ও শান্তি কমিটি গঠিত হয় এবং স্থানীয় রাজার ও শান্তি কমিটি লোকজন ও অন্যান্য ব্যক্তিগণ ২/১ দিন পরপর তাদের বাড়িতে তল্লাশি চালাতো।
হত্যার আগে তার স্বামীকে এনে দিতে জুন মাসের শেষের দিকে এক দল রাজাকার অস্ত্রসহ রাতের বেলায় অতর্কিতে তাদের বাড়িতে হামলা করে। এই সময় তার বৃদ্ধ শ্বশুর আব্দুল হক মিয়া ও আমার দেবর মজিবল হক (১৫) কে ধরে নিয়ে সিলোনিয়া রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যায় সেখানে অমানুষিক নির্যাতন করে, দুই দিন পর্যন্ত বেঁধে রেখে তাদেরকে মারধর করে ছেড়ে দেয়।’

ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ৪৫ বছরেও কুখ্যাত রাজাকার নেতা মকবুলের বিচার হয়নি। এখনও আমি স্বামী হত্যার বিচারের অপেক্ষায় আছি। মৃত্যুর আগে আমি তার ফাঁসি দেখে যেতে চাই। কারণ, মকবুল আহমাদ ও তার ভাই খবির আহমাদের জঘন্য অপরাধ ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্যদের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। দাগনভূঞার হাজার হাজার মানুষ তার সব অপকর্মের দালিলিক প্রমাণসহ সাক্ষ্য দিতে পারবে।’

তিনি তার আবেদনে উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ফেনী এলাকাটি রাজাকার-আলবদর বাহিনীর বড় ঘাঁটি ছিল। বিশেষ করে মকবুল আহমাদের নেতৃত্বে রাজাকারের দাগনভূঞা এলাকায় ছিল তাদের চারণভূমি। মকবুল ও তার ভাই খবির আহমাদের নেতৃত্বে শর্শদীর আবদুল লতিফ মাওলানা, খুশিপুরের নুরুল ইসলাম, সাপুয়ার মোশাররফ হোসেন মোশা, গজারিয়া মাজার বাড়ির নুরুল হক ফারুকী ও এনায়েতপুরের ওয়াজিউল্লাহ পাটোয়ারী,পূর্ব হিরাপুরে আব্দুর রাজ্জাক, খুশিপুরের ইউসুফ, চন্দ্রদীপের নুর আহমেদ, রামচন্দ্রপুরের আবুল হোসেন, নেয়াজপুরের মকবুল, জয়লস্করের নুরুল ইসলাম, পূর্ব হিরাপুরের আব্দুর রাজ্জাক, খুশিপুরের আব্দুল কদ্দুছ, চন্দ্রদ্বীপের আব্দুল মোতালেব ও নুর মোহাম্মদ সহ কয়েক শ’ রাজাকার কয়েক শ’ রাজাকার আলবদর তৎকালীন শান্তি বাহিনীর নেতা মকবুলের নেতৃত্বে এই এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, গুম, ধর্ষণ তাদের মুক্তিকামী মানুষের বাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ পাশবিক নির্যাতন চালায়।

/এইচকে/আপ-এমও/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
নতুন নাম জড়ানোর চেষ্টা বিচার বিলম্বের কৌশল: ডিএমপি কমিশনার
শিশু রামিসা হত্যা মামলানতুন নাম জড়ানোর চেষ্টা বিচার বিলম্বের কৌশল: ডিএমপি কমিশনার
মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি, ব্যাংক খাতের প্রকৃত সংকটও রয়ে গেছে: সিপিডি
মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি, ব্যাংক খাতের প্রকৃত সংকটও রয়ে গেছে: সিপিডি
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী