শিগগিরই ভারি বর্ষণ না হলে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।এছাড়া রাঙামাটি পার্বত্য জেলার আট উপজেলার সঙ্গে নৌযোগাযোগও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মৌসুমের শুরুতে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে কাপ্তাই হ্রদের পানি অনেকটা কমে যায়। পানি কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যে হ্রদের বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর। একে একে প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে হ্রদ পথের নিকটবর্তী উপজেলাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এসব উপজেলায় বসবাসরত প্রায় তিন লক্ষাধিক লোক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাপ্তাই হ্রদের পানি দ্রুত কমে যাওয়ায় জেলার আট উপজেলার সঙ্গে নৌযোগাযোগ প্রায় বন্ধ। উপজেলাগুলো হচ্ছে দুর্গম বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকল, বাঘাইছড়ি, লংগদু, নানিয়াচর ও খাগড়াছড়ি উপজেলার দীঘিনালা এবং মহালছড়ি। এরমধ্যে জুরাছড়ি উপজেলায় হ্রদ পথে প্রায় ১৫ কি.মি., নানিয়ারচর উপজেলায় ১০ কি.মি., বিলাইছড়িতে ২০ কি.মি., বরকলে ১৫ কি.মি. ও লংগদু উপজেলার ৭০ কি.মি. পথ শুকিয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে সংশ্লিষ্ট উপজেলার অফিসপাড়াতেও। কারণ নৌপথে চলাচলকারী উপজেলার অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সময়মত অফিসে যাতায়াত করতে পারছেন না।
এ ব্যাপারে কাপ্তাই হ্রদে চলাচলকারী ইঞ্চিনচালিত বোট মালিক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু জানান, পানি সংকটের কারণে কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন নৌপথে শতশত ইঞ্চিনচালিত বোট চলাচল করতে পারছে না। কোনোভাবে শুধুমাত্র বিলাইছড়ি উপজেলা সদর পর্যন্ত বোট চলাচল করছে। সহসা বৃষ্টিপাত না হলে বিলাইছড়ির সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বলে তিনি জানান। এতে কয়েকশ বোটচালক বেকার হয়ে পড়বে।
এদিকে, নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থায় মারাত্মক সংকটের কারণে জেলায় উৎপাদিত কোটি কোটি টাকার কাঁচামাল বাজারজাত করতে না পারায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন জুমচাষিরা। বিশেষ করে এই জেলায় উৎপাদিত বিপুল পরিমাণে আদা, হলুদ, কলা, আম, কাঁঠাল, আনারসসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও শাকসবজি বাজারজাত করতে না পারায় সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে জনসাধারণের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
হ্রদে পানি সংকটের কারণে কেপিএম এর কাগজ উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল বাঁশ পরিবহনে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। কারণ কাঁচালং, মাইনি, মারিশ্যা, বিলাইছড়ি উপজেলাসহ পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কোটি কোটি টাকার বাঁশ নৌপথে কাপ্তাই কার্গো প্রণালীতে আনা হয়। কিন্তু হ্রদে পানি সংকটের কারণে দুর্গম এলাকা থেকে এসব বাঁশ আনা সম্ভব হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে পিডিবি কাপ্তাই কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. আবদুর রহমান জানান, বর্তমান সময়ে হ্রদে রুলকার্ভ অনুযায়ী পানি থাকার কথা ৮৩ দশমিক ২০ এমএসএল (মিনস সি লেভেল)। সেখানে পানি রয়েছে ৭৮.৩৯ ফুট (মিনস সি লেভেল)। কাপ্তাই কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট। পানি স্বল্পতার কারণে দুটি ইউনিট বন্ধ ছিল। বাকি তিনটি ইউনিটে ১০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়েছে। ৬৬ এমএসএলে পানি নেমে গেলে কেন্দ্রের সবকটি ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে।
লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দিন সেলিম জানান, প্রতি বছর মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে প্রচণ্ড খরায় কাপ্তাই হ্রদের পানি শুকিয়ে যেতে থাকে। তাছাড়া মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে বৃষ্টিপাত হলে সেখানকার কিছু পানি পাহাড়ি ঢলের মাধ্যমে এসে কাপ্তাই হ্রদে জমা হতো। কিন্তু এবার তাও হয়নি। ফলে দ্রুত কাপ্তাই হ্রদের পানি কমছে। এভাবে আর কয়েকদিন চলতে থাকলে রাঙামাটির সঙ্গে উপজেলাগুলোর লঞ্চ ও বোড চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রসঙ্গত, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেওয়া হয়। এতে প্রায় ৭২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশ্বের দীর্ঘতম কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়। হ্রদ সৃষ্টির পর থেকে দীর্ঘ প্রায় ৫৭ বছরে একবারও কাপ্তাই হ্রদে ড্রেজিং করা হয়নি। অথচ প্রতিদিন টনে টনে বর্জ্য কাপ্তাই হ্রদে এসে পড়ছে। ফলে তলদেশ ভরাটসহ নির্ধারিত সময়ের আগেই নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে হ্রদ। হ্রদের পানিধারণ ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে প্রতি বছর শুকনো মৌসুম এলে হ্রদের পানি দ্রুত কমে যায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহতসহ নানামুখী সমস্যা দেখা দেয়। ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালে আরও দু’দফায় আশঙ্কাজনকভাবে হ্রদের পানি কমে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। চলতি মৌসুমেও দ্রুত ভারি বর্ষণ না হলে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ছবি: আবু দারদা খান আরমান
/বিএল/








