বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু পয়েন্টের বাংলাদেশ-মিয়ানামার সীমান্তে গত দুই দিন ধরেই উত্তেজনা চলছে। মুখোমুখি অবস্থায় রয়েছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীও। উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মুখোমুখি এই অবস্থানের মধ্যে অসহায় হয়ে পড়েছে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মধ্যেও এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে।
তমব্রু নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গা নেতা খালেদ হোসেন বলেন, ‘রাতে কাঁটাতারের বেড়ায় মই দিয়ে নো-ম্যানস ল্যান্ডে প্রবেশের চেষ্টা চালায় মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। কিন্তু রোহিঙ্গাদের চিৎকারের কারণে তারা প্রবেশ করতে পারেনি। পরে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে মিয়ানমারের ভেতরে চলে যায় তারা। এরপর রাতভর নীরব থাকলেও আজ শুক্রবার (২ মার্চ) সকাল থেকে আবারও সমবেত হতে দেখা গেছে তাদের।’
আরেক রোহিঙ্গা নেতা আরিফ আহমদ বলেন, ‘২০ ফেব্রুয়ারি বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে বৈঠকের পর আমাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমার সম্মত হলেও এখন তা না করে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে চাইছে। ফলে বোঝা যাচ্ছে যে, মিয়ানমার আমাদের ফেরত নেবে না। মিয়ানমারকে বিশ্বাস করা কঠিন।’
তমব্রুতে অবস্থানকারী রোহিঙ্গা দীল মোহাম্মদ বলেন, ‘মিয়ানমার সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করার কারণে বাংলাদেশের সীমান্তেও বিজিবি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। উভয় দেশ এখন অস্ত্র তাক করে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। যে কোনও মুহূর্তে অঘটন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এই অবস্থায় আমরা দুই বাহিনীর অস্ত্রের মাঝখানে রয়েছি। আমরা ক্যাম্প থেকে বের হচ্ছি না। রাতে মিয়ানমার থেকে গুলির শব্দ পাওয়ায় আমরা আতঙ্কে রয়েছি।’
স্থানীয়রা জানান, ৯ ফেব্রুয়ারি তমব্রু সীমান্তে এসে রোহিঙ্গাদের অন্যত্র সরে যেতে নির্দেশনা দিয়েছেন মিয়ানমারের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল অং সো। এ নির্দেশনার পর থেকে সীমান্তের ওপারে মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের দ্রুত নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে সরে যাওয়ার প্রচারণা চালাচ্ছে মিয়ানমার সরকার। ২০ ফেব্রুয়ারি দু’দেশের মধ্যে বৈঠকের পর এ প্রচারণা বন্ধ রাখা হলেও ১ মার্চ সকাল সাড়ে ৮টা থেকে নতুন করে মাইকিং করা শুরু করেছে। মিয়ানমারের ভেতরে তমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় রোহিঙ্গাদের অবস্থানকে কেন্দ্র করে অন্তত দুই’শ সৈন্য সমবেত হয়েছে। এক মাস আগে থেকে ওখানে আরও দুই’শ সৈন্য অবস্থান করছে। এরা ভারী অস্ত্র নিয়ে রোহিঙ্গাদের হুমকির পাশাপাশি শূন্যরেখা ছেড়ে যেতে মাইকিং করে প্রচারণা চালাচ্ছে। পুরো পরিস্থিতি মিলিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পতাকা বৈঠকের আহ্বান করে চিঠি পাঠানো হয়। তবে দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকার পর অবশেষে ২ মার্চ শুক্রবার তারা বৈঠকে রাজি হওয়ার কথা জানিয়েছে।
সীমান্তে বসবাসকারী স্থানীয় বাংলাদেশি যুবক নুরুল আমিন বলেন, ‘সীমান্তে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীরা অবস্থান নেওয়ায় আমরা খুব আতঙ্কে রয়েছি। অবশ্য বিজিবির পক্ষ থেকে কোনও ধরণের সমস্যা হবে না বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে। তবে আমাদের মনের মধ্যে এক ধরনের অজানা ভীতি কাজ করছে। রাতভর ঘুমাতে পারিনি আতঙ্কে।’
একই কথা বলেছেন স্থানীয় কলেজ ছাত্র আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল। তিনি বলেন, ‘যে কোনও সময় উভয় দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে যেতে পারে। এতে করে শুধু রোহিঙ্গা নয়, আমরা যারা সীমান্তে বসবাস করছি, এই একটি বিশাল জনগোষ্ঠীরও ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে আমরা চরম আতঙ্কে আছি।’
কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে.কর্নেল মনজুরুল হাসান খান বলেছেন, ‘মিয়ানমারে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ করার কারণে আমরা সতর্ক রয়েছি। এতে স্থানীয়দের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বিজিবি সব কিছু পর্যবেক্ষণে করছে।’
আরও পড়ুন-







