নগরী ও আন্তঃজেলা পর্যায়ে পরিবহন সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়েন্ট স্টক কোম্পানির অনুমোদন নিয়েছিল লুসাই পরিবহন লিমিটেড। ১৭ হাজার শেয়ারের বিপরীতে ৬ জনের মালিকানায় ২০১৭ সালের মে মাসে যাত্রা শুরু হয় এই পরিবহন প্রতিষ্ঠানের। ছয়জনের মালিকানাধীন বাসগুলো এই প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে চলাচল করার কথা থাকলেও এখন এটি চলছে পরিবহন মালিক সমিতির আদলে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমোদন ছাড়াই এই পরিবহনের স্টিকার লাগিয়ে ‘অবৈধভাবে’ সড়কে চলছে আড়াইশ থেকে তিনশ গাড়ি। যার বিপরীতে বছরে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এই প্রতিষ্ঠানের নেতারা। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান।
শুধু তা-ই নয়, এই পরিবহনের গাড়ি চলাচলে পদে পদে রয়েছে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার অভিযোগ। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে সড়কে ৩০০ মতো গাড়ি চলাচল করলেও এগুলোর এক-তৃতীয়াংশের রুট পারমিট নেই। ফিটনেস সার্টিফিকেটও নেই অধিকাংশ বাসের। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা।
সম্প্রতি এই পরিবহনের একটি বাসের চালক ও তার সহযোগীর হিংস্রতায় প্রাণ হারিয়েছেন রেজাউল করিম রনি নামে এক যুবক। গত সোমবার (২৭ আগস্ট) বিকালে এই পরিবহনের ৪ নম্বর রুটে চলাচল করা একটি বাস চাপা দিলে রেজাউল গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের দাবি, ভাটিয়ারি থেকে চার নম্বর রুটের ওই গাড়িতে আসার সময় ভাড়া নিয়ে চালক ও তার সহযোগীর সঙ্গে রেজাউলের কথাকাটাকাটি হয়। এর জের ধরে গাড়ি থেকে নামার সময় চালকের সহযোগী তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। পরে তার শরীর ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেন চালক। এতে রেজাউলের মৃত্যু হয়।
দেড় বছর আগে ১৫-২০টি গাড়ি নিয়ে লুসাই পরিবহনের যাত্রা শুরু করলেও স্টিকার বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত এই পরিবহনে বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা। এক বছরের ব্যবধানে ৩০০-এরও বেশি গাড়ি এই পরিবহনের ব্যানারে সড়কে চলাচল করছে বলে জানিয়েছেন মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা। তবে লুসাই পরিবহনের কয়টি বাস আছে এর সুনির্দিষ্ট কোনও হিসাব পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্যন্ত এর কোনও সঠিক তথ্য দিতে পারেননি।
লুসাই পরিবহনের কতগুলো গাড়ি আছে জানতে চাইলে বিআরটিএ চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লুসাই পরিবহনের নামে কোনও বাস আছে কিনা এ তথ্য আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। কারণ, বাসগুলো ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশন করা হয়। কোন মালিকের কয়টি বাস আছে সেটি আমরা বের করে দিতে পারি। কিন্তু কোন সমিতির অধীনে কতটি বাস আছে সেটা আমার জানার কথা না।’
এ বিষয়ে জানতে লুসাই পরিবহন লিমিটেডের চেয়ারম্যান বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে কথা বললে তিনি কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে শহিদুল আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বললে ‘ব্যস্ত আছি, পরে কল করবো’ বলে কেটে দেন। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে আবার কল করলে তিনি তার অফিসে যাওয়ার পরামর্শ দেন। শহিদুল আলম বলেন, ‘আমি এখন দামপাড়ায় আছি। আমাদের কোম্পানির নামে কতটি বাস আছে এর সঠিক সংখ্যা এই মুহূর্তে আমার জানা নেই। অফিসে গিয়ে কাগজপত্র দেখে বলতে হবে। আপনি আমাদের অফিসে আসেন।’
তবে মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল দাবি করেছেন, নগরীর বিভিন্ন রুটে লুসাই পরিবহনের প্রায় ৩০০টির মতো বাস চলাচল করছে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরীর বিভিন্ন রুটে লুসাই পরিবহনের ৩০০-এর বেশি বাস চলাচল করে। এগুলোর মধ্যে ১০০টির বেশি বাসের কোনও রুট পারমিট নেই। ট্রাফিক পুলিশকে মাসোয়ারা দিয়ে এসব বাস সড়কে চলাচল করছে।’
বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, ‘রুট পারমিট ছাড়া বাস চলাচল বন্ধ করতে আমরা বারবার প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু প্রশাসন আমাদের কথায় কোনও কর্ণপাত করেননি। লুসাই পরিবহনের কাছ থেকে মাসিক টাকা নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যরা বাসগুলো চলাচলের ব্যবস্থা করে দেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরীর ৪, ৫, ৬, ৭, ১০ ও ১১ নম্বর রুটে লুসাই পরিবহনের ৩০০-এর মতো বাস চলাচল করে। এরমধ্যে কালুরঘাট থেকে কাঠগড় পর্যন্ত ১০ নম্বর রুটে সবচেয়ে বেশি গাড়ি চলাচল করে। প্রায় ১০০টির বেশি গাড়ি এই রুটে চলাচল করে, যার মধ্যে ৭০-৮০টি বাসের কোনও রুট পারমিট নেই। এই রুটে চট্ট মেট্রো জ-১১-১৭৯৯ পর্যন্ত সিরিয়ালের বাসের রুট পারমিট আছে। এর বাইরে ১৮শ সিরিয়ালের কোনও গাড়ির রুট পারমিট নেই। অথচ বাস্তবে এই রুটে ১৮শ সিরিয়ালের অনেক বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। ১৮শ সিরিয়ালের অধিকাংশ বাস লুসাই পরিবহনের বলে জানিয়েছে মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক সমিতি।
একই অবস্থা অন্যান্য রুটেও। ৪, ৬, ৭ ও ১১ নম্বর রুটের প্রত্যেকটিতে লুসাই পরিবহনের ৪০-৫০টি বাস চলাচল করে। যার মধ্যে ১০-১৫টি গাড়ির রুট পারমিট নেই। ৫ নম্বর রুটে ১৫-২০টি বাস চলাচল করে, যার মধ্যে ৪-৫টি বাসের রুট পারমিট নেই।
শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে সঠিক তথ্য না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে লুসাই পরিবহন লিমিটেডের চেয়ারম্যান বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে আবার মোবাইলে কথা হলে তিনি জানান, তাদের ২০০-২৫০ গাড়ি আছে। এরমধ্যে অধিকাংশ বাসেরই রুট পারমিট আছে বলে তিনি দাবি করেন।
বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের (লুসাই পরিবহন লিমিটেডের নামে) ২০০-২৫০টি বাস সড়কে চলাচল করে। ৫ নম্বর রুট ছাড়া ৪, ৬, ৭, ১০ ও ১১ নম্বর রুটের প্রত্যেকটি আমাদের ৪০-৫০টি করে বাস চলাচল করে। এগুলোর অধিকাংশেরই রুট পারমিট আছে। ৫ নম্বর রুটে আমাদের ৮-৯ বাস চলাচল করে।’
২০০-২৫০ বাসের মধ্যে আপনাদের কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক ও শেয়ার হোল্ডারদের কয়টি বাস আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব বাস আছে ২৬-২৭টি। এরমধ্যে আমার ৫টি বাস আছে। অন্যদেরও ৬-৭টি করে বাস আছে।’
লিমিটেড কোম্পানির অনুমোদন নিয়ে পরিবহন মালিক সমিতির আদলে পরিবহন ব্যবসা করার বিষয়ে জানতে চাইলে বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লিমিটেড কোম্পানির অনুমোদন নিলেও আমরা চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অধিভুক্ত। তাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে আমাদের গাড়িগুলে নগরীতে চলাচল করে।’
লিমিটেড কোম্পানির অনুমোদন নিয়ে সমিতির আদলে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে কোনও বিধিনিষেধ আছে কিনা জানতে চাইলে বিআরটিএ চট্টগ্রাম কার্যালয়েল উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘লিমিটেড কোম্পানি হলে ওই ব্যানারে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালকদের গাড়িগুলো চলাচলের অনুমোদন পাওয়ার কথা। কিন্তু তাদের মেমোরান্ডামে কী আছে সেটি আমার জানা নেই।’
নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (ট্রাফিক-দক্ষিণ) হারুন-অর-রশিদ হাজারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিটি গেটে দুর্ঘটনার পর সড়কে লুসাই পরিবহনের বাস চলাচল কমে গেছে। রুট পারমিট নেই এমন বাসগুলো তারা সড়কে আর বের করছে না। এরপরও আমরা সতর্ক রয়েছি। রুট পারমিট না থাকা কোনও বাস সড়কে চলাচল করতে দেওয়া হবে না।’ এ সময় ট্রাফিক পুলিশকে মাসোয়ারা দিয়ে লুসাই পরিবহনের বাস চলাচলের বিষয়টি এড়িয়ে যান।
লিমিটেড কোম্পানির অনুমোদন নিয়ে লুসাই পরিবহন লিমিটেড মালিক সমিতির আদলে পরিবহন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তারা কী হিসেবে অনুমোদন নিয়েছে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’







