জীবন বীমার কাগজ আনতে গিয়েই প্রাণ হারালেন নুর জাহান। শনিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর ফিরোজ শাহ এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনায় ঘরের ভেতরই তিনি মারা যান। তার সঙ্গে একই ঘরে মাটি চাপা পড়ে মারা যায় তার আড়াই বছর বয়সী মেয়ে ফয়জুন্নেসা ও মা জোহরা বেগম (৬০)।
নুর জাহানের প্রতিবেশী নাছিমা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত দুই দিন টানা বৃষ্টি হওয়ায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই শনিবার (১৩ অক্টোবর) বিকালে ঘরে তালা দিয়ে নুর জাহান তার মেয়ে ও মাকে নিয়ে সমতল ভূমিতে বোনের বাসায় চলে যান। রাতে জীবন বীমার কাগজ ও দরকারি জিনিসপত্র নিতে বোনের বাসা থেকে ঘরে আসেন। তখন বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ায় তারা আর ঘর থেকে বের হতে পারেননি। বাসায় ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমন্ত অবস্থায় পাহাড় ধসে পড়ে তারা মারা যান।’ তিনি জানান, ছয় ছেলে-মেয়েসহ স্বামীকে নিয়ে দীর্ঘদিন ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন নুর জাহান। ঘটনার সময় তার স্বামী ও অপর ছেলে-মেয়েরা বাসায় না থাকায় তারা বেঁচে যান।
নাছিমা বেগম বলেন, ‘নুর জাহান ছয় ছেলে-মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে চাকরি করেন। অন্যরা সবাই ছোট। ঘটনার সময় তারা বাসায় ছিলেন না। তিন জন ভিক্ষা করতো। সকালে ভিক্ষা করতে গিয়ে তারা আর বাসায় ফেরেনি। সন্ধ্যায় তাদের বাবা তাদেরকে বাসায় না এনে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে থাকায় তারা প্রাণে বেঁচে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বড় ছেলে তখন বাসায় ছিলেন। অল্পের জন্য সে বেঁচে যায়। পাশের একটা বাসায় বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। সেখান থেকে বাসায় আসার পর পাহাড় ধস শুরু হয়, সে দ্রুত বের হয়ে আসতে পারে। না হয়, সেও মাটি চাপা পড়ে মারা যেতো।’
রবিবার (১৪ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের একেবারে কিনারা ঘেঁষে ছিল নুর জাহানের ঘর। ওপরে টিনের চালাবিশিষ্ট ঘরের চারপাশে বাঁশের বেড়া। পাহাড় ধসে পড়ে পুরো ঘর মাটির নিচে পড়ে যায়। ওই ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়েই তিন জনের মৃত্যু হয়।
রবিবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবিদা আজাদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস পেয়ে আমরা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে প্রচারণা চালিয়েছিলাম। কিন্তু, তারা সেটি গ্রাহ্য করেননি। তারা যদি নিরাপদে সরে যেতেন, তাহলে আজ এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটতো না। পাহাড় কেটে ঘর বাড়ি তৈরি করার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার ছিন্নমূল মানুষের জন্য আশ্রয়নের ব্যবস্থা করেছে। শহরের ভাসমান মানুষগুলো নিজ নিজ জেলায় চলে গেলে পাহাড় কেটে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমে আসতো।’ তিনি পাহাড় কেটে ঘর বাড়ি তৈরি বন্ধ করতে পরিবেশ অধিদদফতরকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান।
পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা তাহাজ্জুত আলী বলেন, ‘খুলশী ও ফয়েসলেক এলাকার অধিকাংশ পাহাড়ি জায়গা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের। তারা যদি নিজের জায়গাগুলো রক্ষণাবেক্ষণে সক্রিয় থাকতো, তাহলে ভাসমান মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করার সুযোগ পেতো না। প্রাণহানির ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমতো।’








