মানবতাবোধ থেকে ঝুঁকি নিয়েই ভারতীয় জেলেকে উদ্ধার করেন বাংলাদেশি নাবিকেরা (ভিডিও)

হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
১৩ জুলাই ২০১৯, ২৩:২০আপডেট : ১৪ জুলাই ২০১৯, ০০:৩০

উদ্ধারকারী নাবিকদের সঙ্গে ভারতীয় জেলে রবীন্দ্রনাথ দাশ (ছবি– প্রতিনিধি)

‘ছোট হোক বড় হোক, সেও তো একটা জাহাজের লোক। জীবিত একজন মানুষ উত্তাল সমুদ্রে আমাদের চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে। আর আমরা তাকে উদ্ধার করতে চেষ্টা করবো না,সেটা হতে পারে না। শুধু এই মানবিকবোধ থেকেই আমরা ভারতীয় জেলে রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত নেই এবং উত্তাল সমুদ্রে ঝুঁকি নিয়ে তাকে উদ্ধার করি। যদি আমরা তাকে উদ্ধার না করতে পারতাম, তাহলে এই আফসোস সারাজীবন থেকে যেতো। এ কারণে আমরা শান্তিও পেতাম না। সবসময় এটাই মনে হতো, একজন মানুষ আমাদের চোখের সামনে মারা যেতে লাগলো, আর আমরা তাকে বাঁচাতে পারলাম না।’

পাঁচদিন বঙ্গোপসাগরে ভেসে থাকা ভারতীয় জেলে রবীন্দ্রনাথ দাশকে উদ্ধার প্রসঙ্গে কথাগুলো বলেন এমভি জাওয়াদ-এর ক্যাপ্টেন এস এম নাছির উদ্দিন। শনিবার (১৩ জুলাই) রাত ৮টার দিকে রবীন্দ্রনাথের উদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন।

শুক্রবার (১২ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টায় পতেঙ্গা থানায় হস্তান্তরের আগে বিকাল ৪টার দিকে রবীন্দ্রনাথকে নগরীর পতেঙ্গা থানাধীন বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি জেটিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি করা হয়। সেখানে রবীন্দ্রনাথ সাগরে পাঁচদিন ভেসে থাকার বর্ণনা তুলে ধরেন। এসময় তিনি জীবন রক্ষার জন্য এমভি জাওয়াদ, কেএসআরএম, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

উদ্ধারকারী দুই নাবিকের সঙ্গে ভারতীয় জেলে রবীন্দ্রনাথ দাশ (ছবি– প্রতিনিধি)

রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘গত ৫ জুলাই সীমান্তবর্তী এলাকা কেদুয়া থেকে নৌকা নিয়ে আমরা ১৫জন মাছ শিকারে বের হই। পরের দিন ৬ জুলাই উত্তাল স্রোতের ধাক্কায় উল্টে গিয়ে সাগরে ডুবে যাই। এরপর আমরা ১৫ জন একটা বাঁশকে ধরে ২-৩ দিন একসঙ্গেই সাগরে ভাসতে থাকি। পরে একজন একজন করে আলাদা হয়ে তলিয়ে যেতে শুরু করি। সর্বশেষ  বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আমি আর আমার ভাতিজা স্বপন দাশ (২২) ওই বাঁশ ধরে সাগরে ভাসছিলাম। ভাতিজাকে বাঁচাতে আমি আমার গায়ে থাকা লাইফ জ্যাকেট খুলে দিয়েও তাকে রক্ষা করতে পারেননি। এমভি জাওয়াদ আমাকে উদ্ধার করার ঘণ্টা তিনেক আগে বড় একটি ঢেউয়ে সে ভেসে যায়।’

তিনি বলেন, ‘যখন বৃষ্টি হতো, হা করে পান করতাম। বৃষ্টির পানি পান করেই বেঁচে ছিলাম। ঘুমাইনি। চোখ বন্ধ করলেই বাবা-মা, ছেলে-মেয়ের মুখটি ভেসে উঠছিল।’

রবীন্দ্রনাথের উদ্ধার প্রক্রিয়া সম্পর্কে শনিবার এস এম নাছির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেখান থেকে আসুক না কেন, সব কিছুর ওপর সে (রবীন্দ্রনাথ) একজন মানুষ। একজন মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষের বিপদে এগিয়ে আসবো না। তা হতে পারে না। আর আমাদের মেরিনার্সেও কিছু নিয়মনীতি আছে। যেমন কেউ যদি বিপদে পড়ে, সেক্ষেত্রে আমার জাহাজ যেন বিপদে না পড়ে। এমনভাবে থেকে আমাকে তাকে উদ্ধার করতে হবে এবং করা উচিত। এটি নাবিকদের নৈতিক দায়িত্ব। তবে এসব নিয়মনীতির মধ্যে অনেক ফাঁকফোকর আছে। আমি তাকে দেখে না দেখে থাকতে পারতাম। এটির তো কোনও প্রমাণ ছিল না। তবে সবার ওপর মানবতা। একজন মানুষ হয়ে আরেক মানুষকে বাঁচাতে চাইবো, এটিই স্বাভাবিক।’

ভারতীয় জেলে রবীন্দ্রনাথ ২

রবীন্দ্রনাথ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কাকদ্বীপ নারায়ণপুরের বাসিন্দা। গত ৫ জুলাই সীমান্তবর্তী এলাকা কেদুয়া থেকে কাঠের নৌকা নিয়ে তিনিসহ আরও ১৫ জন মাছ শিকারে বের হন। পরদিন তাদের মাছ ধরার ট্রলারটি উল্টে গেলে তিনিসহ অন্যরা সাগরে ভাসতে থাকেন। এরপর গত ১০ জুলাই দুপুরে পৌনে ১টার দিকে কেএসআরএম’র মালিকানাধীন এসআর শিপিংয়ের এমভি জাওয়াদ নামে একটি মাছ ধরার জাহাজের নাবিকরা তাকে উদ্ধার করে। শুক্রবার (১২ জুলাই) তাকে পতেঙ্গা থানা পুলিশের মাধ্যমে ভারতীয় হাইকমিশনারের নিকট হস্তান্তর করা হয়। শনিবার দুপুরে তাকে ভারতে পাঠানো হয়েছে।

কীভাবে তাকে উদ্ধার করা হয় জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন এস এম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘তখন বেলা সোয়া ১১টা। আমরা তাকে ভেসে যেতে দেখি। তখন প্রথমে আমরা চেষ্টা করলাম তাকে ক্যাচ করতে পারি কিনা। যেহেতু সে জাহাজের পাশ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে, তাই আমরা তাকে একটি লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ বয়া ছুড়ে দেই এবং লাইফ বয়ার সঙ্গে রশি বেঁধে আমরা এটিকে ৫০০ থেকে ৬০০ মিটার পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সে লাইফ বয়া ধরতে পারেনি। লাইফ জ্যাকেটটা ধরতে পারে। এরপর ওইটা দিয়ে সে উদ্ধার করার আগ পর্যন্ত ভেসেছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই সময় সাগরে প্রচুর ঢেউ ছিল। তাকে যখন আমরা উদ্ধার করতে পারলাম না, তখন সে ঢেউয়ের সঙ্গে অনেক দূরে চলে যায়। এরপর তাকে জাহাজ থেকে খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না। তখন আমরা তাকে কীভাবে উদ্ধার করবো, একটা পরিকল্পনা করি। সাগর উত্তাল, যেকোনও মুহূর্তে আমরাও বিপদে পড়তে পারি। কারণ হুট করে তো আমরা জাহাজটিকে ঘুরিয়ে ফেলতে পারবো না। ইতোমধ্যে আমরা আমাদের হেড অফিসকে অবহিত করি। সেখান থেকে আমাদের জানানো হয়, যেকোনও মূল্যে যেন আমরা তাকে (রবীন্দ্রনাথ) উদ্ধার করি। এরপর নেভি, কোস্টগার্ডকে জানালাম যে, সমুদ্রে ভেসে থাকা একজনকে আমরা উদ্ধার করতে যাচ্ছি। সমুদ্রে থাকা অন্য জাহাজগুলোকে অবহিত করেছি, আমরা একটা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে যাচ্ছি, তারা যেন আমাদের ক্লিয়ার করে। তারপর আমরা একটা প্যাসেজ ঠিক করলাম যে, কোন পথে গেলে আমরা তাকে পাবো। এরপর জাহাজের একেবারে উঁচুতে উঠে একজনকে বাইনোকুলার দিয়ে দেখতে বললাম, রবীন্দ্রনাথকে দেখা যায় কিনা দেখতে। অন্যরাও দেখার জন্য সতর্ক নজর রাখছিল।’

ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলছেন রবীন্দ্রনাথ দাশ (ছবি– প্রতিনিধি)

এস এম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘এভাবে প্ল্যান মোতাবেক আমরা জাহাজ ঘুরিয়ে সে যেদিকে ভেসে গেছে, সেই দিকে যাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ চলার পর দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে আমরা তাকে অনেক দূরে দেখতে পাই। তাও তাকে খুব ক্লিয়ার করে দেখা যাচ্ছিল না। একবার ঢেউয়ের সঙ্গে তার মাথা ওপরে উঠলে আমরা একটু দেখি, এরপর আবার দেখা যায় না। এভাবে একবার দেখা যায়, আবার দেখা যায় না। এভাবে যখন সামনে দিকে যাচ্ছিলাম, তখন তাকেও ধীরে ধীরে স্পষ্ট দেখতে শুরু করলাম। তারপর আমরা তার প্রায় কাছে চলে গেলাম। জাহাজ থামাতে হবে। সাগরে ঢেউ আছে, তাই জাহাজকে এমনভাবে থামাতে হবে; যাতে ঢেউটা জাহাজের কারণে আড়াল হয়। তারপর আমরা জাহাজ থামিয়ে আবার তাকে লাইফ বয়াটা ছুড়ে দেই। এরপর পেছনের দিকে জাহাজ চালিয়ে তার কাছাকাছি যাওয়ার পর আবার বন্ধ করে দেই। সে কিছুটা এগিয়ে এসে লাইফ বয়াটা ধরে। যখন আমরা তাকে জাহাজের পোর্ট কোয়ার্টার অর্থাৎ জাহাজের পেছনের অংশের দিকে নিয়ে আসলাম, তখন লাইফ বয়াটা টেনে আমাদের পজিশন ক্রেনের মাধ্যমে একটি স্টেজ তার সামনে ফেলি। ওই ধরে সে তখন ওই স্টেজে ওঠার পর আমার ক্রেনের সাহায্যে তাকে ওপরে নিয়ে আসি।’

একটু থেমে এস এম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘দুপুর পৌনে ১টার দিকে রবীন্দ্রনাথকে জাহাজের ডেকে তুলে আনার পর তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া শুরু করি। জাহাজে থাকা সবাই তার টেক-কেয়ারে (যত্ন) ব্যস্ত হয়ে যায়।’

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহাজের চিফ অফিসার প্রিয়তোষ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাগরে ভেসে থাকায় তার (রবীন্দ্রনাথ) শরীরের তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। তখন আমরা তার শরীরের তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য কম্বল দিয়ে তাকে মুড়িয়ে দেই। এরপর তার শরীরে গরম পানির ছিটা দেই, সরিষার তেল গরম করে মালিশ করি। ডাক্তারের পরামর্শে জাহাজে থাকা বিভিন্ন ওষুধ, ইনজেকশন পুশ করার পর দেখলাম, সে দ্রুত রিকভারি করতে লাগলো। তারপর সে আমাদের সব বললো, কোথায় থেকে এসেছে, কীভাবে ঝড়ের কবলে পড়েছে। এরপর সে ঘণ্টা চারেক ঘুমায়। ঘুম থেকে উঠে তার খালাতো ভাইয়ের একটা নম্বর দিয়ে ওই নম্বরে কল দেয় এবং জানায় যে সে বেঁচে আছে। আমরাও তার খালাতো ভাই সুবলের সঙ্গে কথা বলি। এরপর সে তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে চায়। আমরা তাকে তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেই। প্রায় ২০ মিনিট সে তার মা, বাবা, ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে। এরপর সে আবার হোয়াটসঅ্যাপে তার ছেলেমেয়ের সঙ্গে কথা বলে।’

আরও পড়ুন– 

বাংলাদেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ভারতীয় সেই জেলের

 

/এমএ/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের