কুমিল্লা নগরীতে অপরিকল্পিত ও বিল্ডিং কোড না মেনে নির্মিত হচ্ছে প্রায় সাতশ’ বহুতল ভবন। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা এসব ভবন অগ্নিকাণ্ড ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিল্ডিং কোড না মেনে নির্মিত হওয়া এসব দালানের মধ্যে ছয়শ’ ৯০টির বেশি ভবনের মালিক কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) অনুমোদন এবং ছাড়পত্র না নিয়েই নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
২৭ ডিসেম্বর কুমিল্লা নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় এলাকায় রূপায়ণ গ্রুপের নির্মাণাধীন একটি ভবনের তিন তলার ছাদ ঢালাইয়ের সময় ছাদ ধসে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এসময় আহত হয়েছেন আরও ১৪ জন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি খাস জমি ওপরে নির্মিত হচ্ছে রূপায়ণ গ্রুপের একটি বহুতল ভবন। আগে এই জমির ওপরে একটি খাওয়ার হোটেল এবং দীপিকা নামে একটি সিনেমা হল ছিল। পরে রূপায়ণ গ্রুপ ওই জমির ওপর ১৩ তলা ভবন নির্মাণের জন্য অনুমোদন নিয়েছে।
কুসিক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু জানান, ১৯৬২ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ভবন মালিক পক্ষ ৯৯ বছরের জন্য জমিটি লিজ নিয়েছিল। সিটি করপোরশেনর আগে তৎকালীন পৌরসভার সময় এই জমিতে ভবন নির্মাণের জন্য আবেদন করে রূপায়ন গ্রুপ। পৌরসভা সিটিতে রূপান্তরিত হওয়ার পর মালিকপক্ষ ভবন নির্মাণের জন্য পুনরায় আবেদন করে। রূপায়ণ কর্তৃপক্ষ সরকারের খাস জমির ওপর ভবন নির্মাণের জন্য কুসিক থেকে অনুমোদন না পেয়ে ভূমি মন্ত্রাণালয় এবং হাইকোর্ট থেকে রায় নিয়ে আসে। পরে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসকের এক সঙ্গে বসে এ ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিন্টু বেপারি বলেন, নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ধসে শ্রমিক নিহত এবং আহতের ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমাকে এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে। ২৮ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। নির্মাণাধীন ভবনের ছাড়পত্র ও প্ল্যানসহ সব কাগজপত্র নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত চলা অবস্থায় আর কিছু বলা যাচ্ছে না।
কুসিকের প্রকৌশল বিভাগের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, কুমিল্লা নগরীতে নির্মাণাধীন ৪৯৫টি ভবন নকশা বহির্ভূত। বিনা অনুমতিতে নির্মিত হচ্ছে ১৯৫টি বহুতল ভবন। এছাড়াও অতি পুরাতন এবং ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে ৯৫টি ভবন।
কুসিকের নিয়মনীতি এবং অনুমোদনকে তোয়াক্কা না করে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তার মধ্যে অন্যতম শাহ সূজা মসজিদের সামনের শিকদার আনোয়ারা ক্যাসেল ও কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাঁও ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনে স্বর্ণ কুটির আনন্দ কাননসহ আরো কয়েকটি বহুতল ভবন। সিটি কর্পোরেশনের স্থায়ী কমিটি শিকদার আনোয়ারা ক্যাসেলের ৯ তলা ভবনের অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। তবে ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশের ছাড়পত্র এবং সিভিল এভিয়েশনের কোন কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় কুসিক নকশা সরবরাহ করেনি। নির্মাণের অনুমতিও দেয়নি।
কুসিকের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) আবদুর রব ভূঁইয়া জানান, বিল্ডিং কোড না মেনে এবং কুসিকের বিনা অনুমতিতে মালিকপক্ষ শিকদার আনোয়ারা ক্যাসেল নামে বহুতল ভবনটি নির্মাণ করে যাচ্ছে। নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে গত ৪ আগষ্ট এবং ২৪ অক্টোবর দুই দফা নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু তারপর ওই ভবনের নির্মাণ কাজ অব্যাহত রেখেছে।
কুসিক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, নগরীতে নকশা বহির্ভূত এবং বিনা অনুমতিতে ভবন নির্মাণকারীদের তালিকা বড় হচ্ছে। আগামী ১০ জানুয়ারির পর এসব বহুতল ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ৪এপ্রিল নকশা বহির্ভূত কুমিল্লা নগরীর নয়টি ভবনের কাজ বন্ধ করে দেয় কুসিক। পরবর্তীতে ওই নয়টিসহ ১৯টি ভবনে লাল নোটিশ লাগানো হয়। নোটিশে লেখা হয়-‘ভবনটি নকশা বহির্ভূত। এটি থেকে সাবধান থাকার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।’ নোটিশ লাগানোর পর কাজ বন্ধ করতে বলা হয়। তবে নোটিশ লাগানোর এক সপ্তাহের মধ্যে নোটিশের উপর পর্দা দিয়ে ঢেকে দেয় ভবন কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে পর্দার ভিতরে থাকা নোটিশও সরিয়ে ফেলা হয়। এখন পুরোদমে সেগুলোতে কাজ চলছে।








