২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় বেঁচে ফেরা কৃষ্ণ পাটিকর

এখনও ঘুমের মধ্যে ভয়ে কেঁপে উঠি

ইব্রাহীম রনি, চাঁদপুর
২১ আগস্ট ২০২২, ২২:১৮আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২২, ২২:৪২

ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে দলের নেতাকর্মীসহ ২৪ জন নিহত হন। শেখ হাসিনাসহ দলের কয়েকশ নেতাকর্মী আহত হন।

ভয়াবহ সেই হামলায় আহত হন চাঁদপুরের কচুয়া পৌর আওয়ামী লীগের সে সময়ের দফতর সম্পাদক কৃষ্ণ পাটিকর। প্রাণে বেঁচে গেলে এখনও তার শরীরে রয়ে গেছে স্প্লিন্টারের দাগ। সেই স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায়।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমাবেশে যোগ দেন কৃষ্ণ পাটিকর। তার বাড়ি কচুয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে। গ্রেনেড হামলায় আহত হওয়ার ১৮ বছরেও কোনও সহযোগিতা পাননি তিনি। বিভিন্ন স্থানে কয়েক দফায় চিকিৎসা নিলেও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি। এরইমধ্যে কয়েকবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সহায়তার আবেদন করেছেন। সেই আবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছেছে কিনা তাও জানেন না নেতাকর্মীরা।

কৃষ্ণ পাটিকরের স্বজনরা জানান, বর্তমানে কচুয়া বিশ্বরোড এলাকায় ছেলে অসীম পাটিকরের জয়গুরু ওয়ার্কশপে ছেলেকে সহযোগিতা করেন কৃষ্ণ পাটিকর। তবে ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। চিকিৎসাসেবা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।

শারীরিক দুরবস্থার কথা জানিয়ে কৃষ্ণ পাটিকর বলেন, ‘গ্রেনেড হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে ভারী কোনও কাজ করতে পারি না। এ পর্যন্ত কারও কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা পাইনি। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তিন বছর আগে একটি দরখাস্ত দিয়েছিলাম। কয়েক মাস আগে আবারও আবেদন করেছি। তার কাছে আমার দরখাস্ত পৌঁছেছে কিনা জানি না। যদি দরখাস্ত পৌঁছাতো তাহলে সহায়তা পেতাম বলে আমার বিশ্বাস।’

এখনও স্প্লিন্টারের দাগ আমার শরীরে রয়ে গেছে উল্লেখ করে কৃষ্ণ পাটিকর বলেন, ‘অনেক জায়গায় চিকিৎসা নিয়েছি। এখনও শরীরের স্প্লিন্টারের আঘাতের চিহ্ন আছে। প্রতি বছর শীতের সময় আমার শরীর অবশ হয়ে যায়। সোজা হতে পারি না। গ্রেনেড হামলার সময় জীবন বাঁচাতে রাস্তায় শুয়ে পড়েছিলাম। অনেক মানুষের ছোটাছুটির কারণে পদপিষ্ট হয়ে কোমরে মারাত্মক আঘাত পাই। বর্তমানে মাসে চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। এ টাকার জোগান দিতে পারি না।’

সেদিনের স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নেত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে কচুয়া থেকে আমি, তৎকালীন উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আহসান হাবীব প্রাঞ্জল, দেবীপুর গ্রামের মিজানুর রহমান ও আব্দুল গফুরসহ চার জন সমাবেশে যোগ দিই। সমাবেশে ট্রাকের ওপর স্থাপিত অস্থায়ী মঞ্চের কাছাকাছি ছিলাম আমরা। আমাদের নেতা ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে মঞ্চে উঠিয়ে দিয়ে সমাবেশস্থলে বসে পড়ি আমরা। কিছুক্ষণ পর প্রাঞ্জল বলেন, আমি একটু পানি খেয়ে আসি। এর ফাঁকে শুরু হয় নেত্রীর বক্তব্য। মনোযোগ সহকারে বক্তব্য শুনছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো সমাবেশস্থল। আশপাশে তাকিয়ে দেখি, আমাদের নেতাকর্মীরা মাটিতে শুয়ে পড়েছেন, অনেকে ছোটাছুটি করছেন। কিছুক্ষণ পর দেখি আমার শরীর গরম লাগছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছি না। তখন শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখি রক্ত ঝরছে। দেখেই আঁতকে উঠলাম। অন্যদের সঙ্গে ছোটাছুটি শুরু করলাম। কিছুদূর এগোতেই আমাদের নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে দেখলাম। মনে হচ্ছিল তিনি যেকোনও দিক দিয়ে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন, কিন্তু পথ পাচ্ছেন না। এ সময় একটি ভ্যানগাড়ি পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। ভ্যান থামিয়ে মহীউদ্দীন খানকে তুলে দিলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, আহত অবস্থায় আমাদের নেত্রীকে গাড়িতে তোলা হচ্ছিল। তখন নেত্রীর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। কয়েকজন নেতাকর্মী মানবদেয়াল তৈরি করে নেত্রীকে রক্ষা করে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যান।’ 

প্রাণে বেঁচে গেলে এখনও তার শরীরে রয়ে গেছে স্প্রিন্টারের দাগ

তিনি বলেন, ‘আমি রক্তাক্ত অবস্থায় ঘটনাস্থলের পাশে আল মক্কা ট্রাভেলসের মালিক জামালের কাছে যাই। সেখানে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফেরার পর দেখি, জামালের সহযোগী আমার রক্তাক্ত কাপড় পরিবর্তন করে তোয়ালে দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছেন। পরে আমাকে মনোয়ারা হসপিটালে নিয়ে যান জামাল ও তার সহযোগী। সেখানে গিয়ে প্রাঞ্জলকে দেখি। ওই অবস্থায় আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেন প্রাঞ্জল। সেদিন আহত অবস্থায় অনেক নেতাকর্মীকে ওই হসপিটালে নেওয়া হয়েছিল। কারও হাত নেই, কারও পা নেই, কেউ মৃত। পরে প্রাঞ্জল চিকিৎসক ডেকে আমার পায়ের এবং কোমরের স্প্লিন্টার বের করে দেন। প্রাঞ্জল সেদিন আমার চিকিৎসার দায়িত্ব না নিলে হয়তো বেঁচে ফিরতাম না। সকালে কিছুটা সুস্থবোধ করলে প্রাঞ্জলকে বলি আমি বাড়ি যাবো। প্রাঞ্জল আমাকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এনে কচুয়ার সুরমা বাসে তুলে দেন। পরদিন অসুস্থ হলে পরিবারের লোকজন আমাকে কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। এরপর সুস্থ হই। তবে গত ১৮ বছর ধরে যন্ত্রণার সঙ্গে জীবন কাটছে আমার। শরীরে বিদ্ধ স্প্লিন্টারের দাগ আজও মোছেনি। এখনও ঘুমের মধ্যে ভয়ে কেঁপে উঠি।’

কচুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইয়ুব আলী পাটোয়ারী বলেন, ‘কৃষ্ণ পাটিকর একজন ত্যাগী নেতা। আওয়ামী লীগের সব সভা-সমাবেশে ছুটে যান। গ্রেনেড হামলায় বেঁচে গেলেও এখনও পুরোপুরি সুস্থ হননি। শুনেছি তিনি কোনও ধরনের সহায়তা পাননি। আমরা তাকে দলীয়ভাবে সার্বিক সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।’

কচুয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আহসান হাবিব প্রাঞ্জল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি সেসময় উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। ২১ আগস্ট আমরা কচুয়া থেকে চার জন সমাবেশে অংশ নিয়েছিলাম। নেত্রীর বক্তব্যের শেষ দিকে আমি পানির বোতল আনতে যাই। এরপরই গ্রেনেড হামলা হয়। হামলায় আমাদের চার জনের মধ্যে কৃষ্ণ পাটিকর গুরুতর আহত হন। আমরাও কমবেশি আহত হয়েছিলাম। মনোয়ারা হসপিটালে চিকিৎসার পর তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। সহযোগিতা চেয়ে তিনি কয়েকবার দরখাস্ত করেছেন, কিন্তু এখনও সহযোগিতা পাননি। বিষয়টি দলের সিনিয়র নেতাদের জানানো হবে।’

এ বিষয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আপনারা জানেন আমিও সেদিন আহত হয়েছিলাম। আমার জানামতে, যারা আহত হয়েছেন প্রত্যেকে সহযোগিতা পেয়েছেন। তবে কৃষ্ণ পাটিকর কেন এখন পর্যন্ত কোনও সহযোগিতা পাননি তা আমি বলতে পারছি না। এ বিষয়ে খোঁজ নেবো।’

/এএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত অর্ধশতাধিক
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহরে হামলা-ডিম নিক্ষেপ, পুলিশ বলছে মিথ্যা 
দিল্লির অগ্নিকাণ্ডে ৫ বাংলাদেশি আহত
সর্বশেষ খবর
তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে: জামায়াত
তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে: জামায়াত
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি