বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ বাংলাদেশের উপকূলে ধেয়ে আসছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ছয় নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বেলার পর সোমবার দুপুর থেকে উপকূলীয় এলাকার লোকজনকে সরিয়ে নিতে বলেছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাহিদ ইকবাল।
তিনি জানান, দুর্যোগের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে জেলায় ৫৭৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে ছয় লাখ পাঁচ হাজার ২৭৫ জন মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে খোলা হয়েছে ৯টি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১০৪টি মেডিক্যাল টিম। এছাড়া মজুত আছে ৩২৩ মেট্র্রিক টন চাল, আট লাখ ২৫ হাজার নগদ টাকা ও এক হাজার ১৯৮ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৩৫০ কার্টন ড্রাই কেক, ৪০০ কার্টন বিস্কুট।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ঝড়ের আগেই সবাইকে নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রত্যেক ইউনিয়নে মেডিক্যাল টিম প্রস্তুতকরণ, পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও খাওয়ার পানি মজুত রাখা, দুর্যোগকালীন ও ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর জন্য ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, যেকোনও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক দল, কোস্টগার্ড সদস্য, নৌ-পুলিশ সদস্য, ২ হাজার ২০০ জন রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবক এবং ৮ হাজার ৬০০ জন সিপিপি সদস্য প্রস্তুত রয়েছে। সাইক্লোন সেন্টারে সম্ভাব্য আশ্রয় গ্রহীতাদের জন্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারী, পুরুষ, গর্ভবতী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে সকাল থেকে কক্সবাজারে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। অমাবস্যার কারণে সামুদ্রিক জোয়ারের পানি দুই থেকে তিন ফুট বেড়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় পর্যটকদের নিরাপদ দূরত্বে থেকে সৈকত ভ্রমণের জন্য সতর্ক করছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ, লাইফ গার্ড ও বিচ কর্মীরা। সৈকতে পর্যটকদের গোসল করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, আজ সকাল ৬টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৫২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণ দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছিল ‘সিত্রাং’। এটি আরও ঘনীভূত ও উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে আগামীকাল ভোর থেকে সকাল নাগাদ খেপুপাড়ার কাছ দিয়ে বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর বিক্ষুদ্ধ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে নিরাপদে চলে আসতে বলা হয়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপের সাথে পর্যটকবাহী জাহাজসহ নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান জানান, সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেোজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না আসা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা চলবে। একইভাবে পর্যটকদের ‘বুকিং মানি’ ফেরত দিতে হোটেল ও জাহাজ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জানান, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পাঁচ লক্ষাধিক লোক ধারণের ক্ষমতা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে উপকূলের লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা হাতে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারি সব কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিলের পাশাপাশি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ৯ উপজেলায় খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।









