প্রথমবারের মতো কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন হচ্ছে শনিবার (৫ নভেম্বর)। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত নগরী। মূলত সম্মেলনে দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশকে দাওয়াত না দেওয়া নিয়েই ঘটনার সূত্রপাত।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় এমপি বাহাউদ্দীন বাহার তার গ্রুপের আওয়ামী নেতাদের নিয়েই মহানগর সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। যে কারণে দাওয়াত পাননি মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আঞ্জুম সুলতানা সীমা সমর্থিত নেতাকর্মীরা। দাওয়াত না পাওয়া নেতাকর্মীরাও সম্মেলনে যেতে প্রস্তুত। ইতোমধ্যে বৃহস্পতিবার জেল হত্যা দিবসে সীমা সমর্থিত নেতাকর্মীদের শোডাউন ও শুক্রবার এমপি বাহার সমর্থিত নেতাকর্মীদের শোডাউন এক রকম মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে মহানগর আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপকে।
তবে বাহারের অনুসারী নেতাদের দাবি, সম্মেলনে দলের নেতাকর্মীদের দাওয়াত দেওয়া লাগে না। দলকে ভালোবেসে এমনিতেই তারা আসবেন। তারাও প্রস্তুত সব বাধা কাটিয়ে একটি সফল সম্মেলন করতে।
কেন মুখোমুখি এমপি বাহার ও সীমা?
দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমান কমিটির সভাপতি স্থানীয় সংসদ সদস্য আকম বাহাউদ্দীন বাহার ও সাধারণ সম্পাদক তারই গ্রুপের নেতা সিটি করপোরেশন মেয়র আরফানুল হক রিফাত। এছাড়া কমিটির ৭১ সদস্যের অধিকাংশই বাহার অনুসারী। কেউ সরাসরি বাহারের পক্ষে আবার কেউ সমীহ করে চলেন। অধিকাংশ নেতা বাহারপন্থী হওয়ায় মহানগরের ২৭টি ওয়ার্ড কমিটি ও নির্বাচনের সময় তার গ্রুপের নেতারাই মনোনয়ন পেয়ে আসছেন। এতে রাজনৈতিক ও দলীয় আধিপত্য পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে বাহারের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
অপরদিকে, সব দিক দিয়ে বঞ্চিত হচ্ছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় একটি পক্ষের নেতাকর্মীরা। পদবঞ্চিত ও অবহেলিত নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন। ইতোমধ্যে অনেক সিনিয়র নেতা এমপি সীমার পক্ষে চলে গেছেন। কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে বাহারের বিরোধিতা করেছেন। সম্প্রতি সম্মেলন ঘিরে ওসব নেতারা দাওয়াত না পাওয়ায় তাদের নিয়ে মাঠে নেমেছেন এমপি সীমা। এর মধ্য দিয়ে এমপি বাহার ও সীমার বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।
সীমা গ্রুপের বক্তব্য:
৩ নভেম্বর জেল হত্যা দিবসে শোক মিছিল করেছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আঞ্জুম সুলতানা সীমা এমপি সমর্থিত নেতাকর্মীরা। মিছিল শেষে নগরীর কেন্দ্রস্থল পূবালী চত্বরে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সীমা ও তার অনুসারী নেতৃবৃন্দ।
সমাবেশে এমপি সীমা বলেন, ৫ নভেম্বর আমরা শান্তিপূর্ণ সম্মেলন চাই। সবাই সম্মেলনে যোগ দিতে চাই। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সম্মেলনে যাবো। কেউ যদি বাধা দেয় আমরা উচিত জবাব দেবো।
একই সমাবেশে মহানগর আওয়ামী লীগের মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক কবিরুল ইসলাম শিকদার বলেন, যদি আমাকে সম্মেলনে যেতে বাধা দেওয়া হয় তাহলে প্রতিহত করবো।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শুক্রবার মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আনিসুর রহমান মিঠু বলেন, উনি (এমপি বাহার) রাজনীতির শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের মূলধারার নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলতেন। জেলার কোনও নেতা ওনাকে পছন্দ করেন না। উনি পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি করেন। কাউকে মূল্যায়ন করতেন না। তবে আমরা বিরোধিতা করে একত্রিত হওয়ার পর উনি নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না রাখলেও বিএনপি ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ওনার সম্পর্ক ভালো। উনি বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিজের অনুসারী নেতা না পেয়ে জাতীয় পার্টি ও জামায়াত-বিএনপি থেকে লোক নিয়ে কমিটি দিয়েছেন। আমরা এসব নিয়ে কথা বলি। তাই তিনি আমাদের কমিটিতে বা আওয়ামী লীগে দেখতে চান না। এগুলোর তালিকা করেছি আমরা। নেত্রীর কাছে ওই তালিকা পাঠিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, উনার অনুসারীরাই আমাদের বলেছেন, আফজল খান সাহেবের (এমপি সীমার বাবা) সঙ্গে থেকে রাজনীতি করেছেন বাহার সাহেব। তখন থেকেই উনি এসব কর্মকাণ্ড করে আসছেন। ভাবলাম যখন নেতৃত্বে এসেছেন, ভালো হবেন। কিন্তু কিছুই হলো না।
এ বিষয়ে সীমা গ্রুপের আরেক নেতা নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম বলেন, কেন উনি সম্মেলন থেকে আমাদের বাদ দিচ্ছেন কে জানে। কেন উনি আমাদের মুখোমুখি হতে চাচ্ছেন, উনি ভালো জানেন। আওয়ামী লীগ তো শুধু ওনার একার নয়। ৪০ বছর শ্রম, ঘাম ও অর্থ দিয়েছি। অনেক নির্যাতন আমরা সহ্য করেছি। কেন উনি একা একা সম্মেলন করতে চাচ্ছেন, সেটাই প্রশ্ন। এতে এটাই প্রমাণিত হয়, উনি পকেটের লোক ছাড়া কাউকে আওয়ামী লীগ করতে দেবেন না। যাদের উনি ভয় পেয়ে বাদ দিতে চাচ্ছেন আমরা সীমা আপার নেতৃত্বে একত্রিত হয়েছি। আমরা সম্মেলনে যাবো, এটা নিশ্চিত।
এ বিষয়ে এমপি সীমা বলেন, উনি (এমপি বাহার) আমার নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে সম্মেলন করতে চাচ্ছেন, কিন্তু তা হবে না। আমরা সম্মেলনে যাবো। সম্মেলনে যেতে যদি কোনও বাধা আসে প্রতিহত করবো। এটাই আমাদের সিদ্ধান্ত।
বাহার গ্রুপের বক্তব্য:
বাহার গ্রুপের নেতা ও মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুর রহমান জাহাঙ্গীর বলেন, দুই পরিবারের দূরত্ব আছে এটা অস্বীকারের সুযোগ নেই। কিন্তু যদি সীমা দলের সব কর্মকাণ্ড থেকে দূরে না গিয়ে একইসঙ্গে এগিয়ে আসতেন, তাহলে এই দূরত্ব থাকতো না। আমরা বারবার চাইছিলাম, তারা আসুক। এখনও চাই, সম্মেলনে তারা আসুক। কারণ তারাও আওয়ামী পরিবারের। তারাও আমাদের দলের। আশা করছি, এ নিয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি বাহার গ্রুপের নেতা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত বলেন, সম্মেলন থেকে কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা কখনও দলের সঙ্গে বেঈমানি করিনি। আর করবোও না। তারা জেল হত্যা দিবসে যেভাবে ঢাকঢোল পিটিয়েছে, তা নিয়ে আর কি বলবো। এখন এসব নিয়ে কিছু বলতে চাই না। সম্মেলন সফল করতে চাই।
সার্বিক বিষয়ে জানতে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আকম বাহাউদ্দীন বাহারকে একাধিকবার কল ও পরে মেসেজ দিলেও কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। তাই তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
শনিবার কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন উদ্বোধন করবেন দলের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং কেন্দ্রীয় নেতারা। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পর ২০১৭ সালের ২২ জুলাই কেন্দ্র থেকে প্রথমবারের মতো মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ৭১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে সভাপতি করা হয় সদর আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম বাহাউদ্দীন বাহারকে আর সাধারণ সম্পাদক করা হয় বর্তমান মেয়র আরফানুল হক রিফাতকে।









