গত বছরের ৪ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৫১ জনের মৃত্যু হয়। আগুনে দগ্ধ হয়ে আহত হন অন্তত দুই শতাধিক। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও এখন পর্যন্ত এ মামলায় কেউ গ্রেফতার হয়নি। শেষ হয়নি মামলার তদন্তও। এমনকি নিহতদের মধ্যে এখনও আট জনের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। তাদের লাশ এখনও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রক্ষিত আছে। এ ঘটনার আট মাস পর মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত অক্সিজেন কারখানা সীমা অক্সিজেন অক্সিকো প্ল্যান্টে শনিবার ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলো।
শনিবার বিকাল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে অক্সিজেন প্ল্যান্টে বিস্ফোরণ ঘটে। এ বিস্ফোরণে এখন পর্যন্ত ছয় জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২২ জন।
আট মাস আগে বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনায় ৭ জুন রাতে সীতাকুণ্ড থানার এসআই আশরাফ সিদ্দিকী বাদী হয়ে ডিপোর আট কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। মামলায় মালিকপক্ষকে বাদ দিয়ে কর্মচারীদের আসামি করা হয়।
আসামিদের মধ্যে রয়েছে- বিএম কনটেইনার ডিপোর মহাব্যবস্থাপক নাজমুল আক্তার খান, উপ-মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) নুরুল আক্তার খান, ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) খালেদুর রহমান, সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্বাস উল্লাহ, জ্যেষ্ঠ নির্বাহী (প্রশাসন) নাছির উদ্দিন, সহকারী ব্যবস্থাপক আবদুল আজিজ, ডিপোর শেড ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম ও সহকারী ডিপো ইনচার্জ নজরুল ইসলাম। তবে গত আট মাসে এই মামলায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
মামলার এজাহারে বলা হয়, বিএম কনটেইনার ডিপোতে ড্রামভর্তি কেমিক্যাল কনটেইনারে থাকার কথা ফায়ার সার্ভিসকে জানায়নি মালিকপক্ষ। এ কারণে কেমিক্যালভর্তি কনটেইনারের আগুন পানিতে নেভানো সম্ভব হয়নি। কেমিক্যালের কারণে এক কনটেইনার থেকে আরেক কনটেইনারে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে দায়িত্বরত জেলা পুলিশের এএসআই আলাউদ্দিন তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডে ৫১ জন নিহত হন। এর মধ্যে পুড়ে যাওয়া ২১ লাশের ডিএনএ নমুনা সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়ার পর ১৩ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এখনও আট জনের লাশ হাসপাতাল মর্গে আছে। এর মধ্যে একজনের লাশ কক্সবাজার মেডিক্যাল মর্গে। বাকি সাত জনের লাশ আছে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ মর্গের হিমাগারে। ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়ার পর লাশগুলো স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’
এদিকে বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণে নিহতদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্য। এর মধ্যে ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। বাকি তিন জনের লাশ এখনও শনাক্ত হয়নি। তাদের ডিএনএ নমুনা ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। তিন জনের মধ্যে দুজন সীতাকুণ্ড ফায়ার সার্ভিসের সদস্য রবিউল ইসলাম ও ফরিদুজ্জামান। অপরজন কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের সদস্য শফিউল।
বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা মামলা তদন্ত করছে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর মোস্তাক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএম কনটেইনার ডিপোতে নিহত সবার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এখনও পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি অনেক আহতদের মেডিক্যাল সার্টিফিকেট (এমসি) এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ কারণে মামলার তদন্ত ধীরগতি হচ্ছে। এমসি ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলে দ্রুত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া যাবে।’
বিএম ডিপো সূত্র জানায়, বিস্ফোরণের পর গত নভেম্বরে বিএম কনটেইনার ডিপোর আমদানি-রফতানি পণ্য ব্যবস্থাপনা পুরোদমে শুরু হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ডিপো ব্যবহার করে আমদানি-রফতানি ও খালি কনটেইনার সংরক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। ডিপো সংস্কার করার পর গত ২২ আগস্ট শুধু খালি কনটেইনার সংরক্ষণের অনুমোদন দেয় কাস্টমস। গত ২৫ অক্টোবর ৯ শর্তে পোশাকপণ্য রফতানি কার্যক্রম ব্যবস্থাপনার অনুমোদন দেওয়া হয়। শর্ত পরিপালন করায় গত ৭ নভেম্বর আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পুরোদমে শুরুর অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে বিএম ডিপো রাসায়নিক পণ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশের স্মার্ট গ্রুপ ও নেদারল্যান্ডসের একটি প্রতিষ্ঠান মিলেমিশে বিএম কনটেইনার ডিপো চালু করে।









