চাঁদপুর প্রতিদিনের সম্পাদক ও সমকালের চাঁদপুর প্রতিনিধি ইকবাল হোসেন পাটোয়ারী এবং বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি ইব্রাহীম রনির বিরুদ্ধে করা মামলা খারিজের বিরুদ্ধে রিভিশন করা হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম খানের পক্ষে রিভিশনটি করেন তার সহযোগী আব্দুল কাদের মিয়া।
গত বছরের মার্চে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছিল। মামলার তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় তা খারিজ করে দেন চাঁদপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক। বাদীপক্ষ রিভিশন আবেদন করলে গত ১০ এপ্রিল ইস্যু করা সমনটি বুধবার (১২ এপ্রিল) হাতে পান দুই সাংবাদিক। আগামী ২ মে মামলার রিভিশন শুনানির দিন ধার্য রেখেছেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত।
এই মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের ২২ মার্চ চাঁদপুর প্রতিদিনে প্রকাশিত ‘চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত নৌযান জব্দ ও জড়িতদের গ্রেফতারের নির্দেশ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। এ সংবাদের ভেতরে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নাম উল্লেখ করে সেলিম খানের নামে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা তথ্যনির্ভর মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এ জন্য সেলিম খানের ৫০ কোটি টাকার মানহানি করার অভিযোগ আনা হয় ওই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই সংবাদে ‘২০১৫ সাল থেকে পদ্মা-মেঘনা নদী থেকে যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করে আসছেন ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম খানের একটি চক্র’। নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘আদালত তাদেরকে কয়েকটি নির্দিষ্ট মৌজায় ড্রেজিংয়ের অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু সেই মৌজাগুলো কোথায় তার কোনও ম্যাপ তাদের কাছে নেই’।
এ বিষয়ে সাংবাদিক ইকবাল হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ‘চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত নৌযান জব্দ ও জড়িতদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছে নদী রক্ষা কমিশন। নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরীর বক্তব্য এবং নির্দেশনার আলোকে সংবাদটি করা হয়েছে। অন্যান্য যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো ইতোমধ্যে আদালতের রায়ে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। মূলত ইলিশসহ সরকারি সম্পদ রক্ষায় অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে অর্থ লোপাটের চেষ্টার বিরুদ্ধে যারা সংবাদ করছে, তাদের দমিয়ে রাখার প্রচেষ্টা এটি। তবে তারা মামলা-হামলা করে সত্য প্রকাশ থেকে আমাদের বিরত রাখা যাবে না।’
এ বিষয়ে চাঁদপুর আদালতের আইনজীবী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আদালত যে মামলার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন, সেটি পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছে বাদীপক্ষ। এর মধ্য দিয়ে বাদীপক্ষ বলতে চায়, মামলা খারিজের রায় ঠিক হয়নি। এই আবেদনের আইনি ভিত্তি থাকলে মঞ্জুর হবে এবং মামলাটি সামনে প্রসিড হবে। ভিত্তি না থাকলে আবারও খারিজ করবেন আদালত।’
তিনি বলেন, ‘আদালত যথার্থভাবে মামলা খারিজের আদেশ দিয়েছেন। এখন সাংবাদিকদের হয়রানি করার জন্য রিভিশন করেছেন তারা।’
উল্লেখ্য, চাঁদপুরের নদী অঞ্চল থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোল করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম খানসহ একটি চক্র। এমনকি অনুমতি ছাড়াই চেয়ারম্যান বছরের পর বছর বালু বিক্রি করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য ও সরকারি দফতরের নথিপত্র অনুযায়ী, বালু উত্তোলনের কারণে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করেও নদীভাঙন প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইলিশ সম্পদসহ নদীর জীববৈচিত্র্য। সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। এ অবস্থায় চাঁদপুরের নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধে ভাঙনকবলিত মানুষ, জেলে ও জেলা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষজনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বিআইডব্লিউটিএ, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, পানি উন্নয়ন বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতামত ও চিঠির আলোকে সরকারি সম্পদ ও ইলিশ রক্ষায় ভূমি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নদী রক্ষা কমিশসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি দেন সাবেক জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ। ওই চিঠির পর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৎস্য অধিদফতর, বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, চাঁদপুরের জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে সম্পৃক্ত নৌযান জব্দ ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের তৎপরতায় উচ্চ আদালত বালু উত্তোলন বন্ধের রায় দেন। এরপরও সেলিম খান ও তার চক্রের অন্যরা বালু উত্তোলন করতে নানামুখী চেষ্টা চালিয়ে যায়। এরই অংশ হিসেবে তারা একাধিক রিট করেন। এরই মধ্যে সেলিম খানের বিরুদ্ধে ৩৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের সহকারী পরিচালক আতাউর রহমান বাদী হয়ে গত বছরের ১ আগস্ট এই মামলা করেন। ওই মামলায় ১২ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সম্প্রতি তিনি জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বের হন।









