মানবিক কাজ করে আলোচনায় আসা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বন্দর জোনের কর্ণফুলী থানার কনস্টেবল শওকত হোসেনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে শওকত হোসেন বলেছেন, ‘পুলিশ বাহিনীতে থেকে মানুষের সেবা এবং মানবিক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। ছোট পদে থেকে বড় কাজ করছি। বিষয়টি অনেকে ভালো চোখে দেখে না। বারবার বাধা আসছিল। এ জন্য চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জীবনের বাকি সময় অসহায় মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই।’
বৃহস্পতিবার (২৭ এপ্রিল) বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন তিনি। শওকত বলেন, ‘আমার স্ত্রী এবং দুই ছেলেসন্তান আছে। এর মধ্যে বড় ছেলের বয়স পাঁচ বছর এবং ছোট ছেলের চার বছর। আগামীকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মসজিদের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে চাকরি ছাড়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানাবো।’
৭১ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলাম। এরপর হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে বিশ্রামে ছিলাম। এরই মধ্যে অসহায় মানুষের সেবায় নিয়োজিত হই। ফলে কর্মস্থলে উপস্থিত হতে পারিনি।’
চাকরি ছাড়ার পর এখন কী করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে শওকত বলেন, ‘এখনও কিছু করছি না। সংসারের কাজ এবং মানুষের সেবা নিয়েই আছি। বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাওয়া যায়। এ ছাড়া কৃষিজমি আছে, সেখান থেকে মাসে ১০ হাজার টাকা আয় হয়। এসব দিয়েই সংসার খরচ চলছে। আমার বড় ভাই শিল্পপতি। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে। বড় ভাই তার ব্যবসা দেখাশোনার জন্য বলেছেন। তাই করবো, ভাবছি।’
মানবিক কাজে কীভাবে বাধা আসছে জানতে চাইলে শওকত বলেন, ‘২০০৯ সালে ঢাকা থেকে রাঙামাটিতে বদলি করা হয়। সেখান থেকে দামপাড়া বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে বদলি করা হয়। ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ডবলমুরিং থানা এলাকায় একটি মাহফিলে অতিথি হয়ে বক্তব্য দিই। সেখানে দেওয়া বক্তব্যের জেরে দামপাড়া হাসপাতাল থেকে বদলি করা হয় কর্ণফুলী থানায়। এরপর থেকে মানবিক কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। কর্ণফুলী থানা থেকে বদলি করা হয় চট্টগ্রাম রেঞ্জে। সেখান থেকে বদলি করা হয় কুমিল্লায়। এভাবে তো মানবিক কাজ করা যায় না।’
আরও পড়ুন: আলোচিত পুলিশ সদস্য শওকত চাকরিচ্যুত, কারণ জানালেন উপকমিশনার
তাকে চাকরিচ্যুতির আদেশে বলা হয়েছে, ‘শওকত হোসেন ৭১ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যা থাকায় এবং বেওয়ারিশ মানুষ নিয়ে মানবিক কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকায় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এমন বক্তব্য লিখিতভাবে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর চাকরিচ্যুত করা হয়।’
আদেশের কপিতে আরও বলা হয়, ‘কর্ণফুলী থানায় দায়িত্বরত কনস্টেবল শওকত হোসেন ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর অসুস্থ হলে দামপাড়া হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। ওই বছরের ৮ নভেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এরপর চিকিৎসক এক সপ্তাহের পূর্ণ বিশ্রামের পরামর্শ দিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেন। কিন্তু ওই বছরের ৯ নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭১ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। গত ১১ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত জবাব দেন শওকত। সেখানে উল্লেখ করেন, “বেওয়ারিশ মানুষকে নিয়ে মানবিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকায় পুলিশ কনস্টেবল পদে তার চাকরি করা সম্ভব নয়”।’
শওকত হোসেন নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার বাসিন্দা। ২০০৫ সালে পুলিশ কনস্টেবল পদে যোগ দেন।
তাকে চাকরিচ্যুত করার বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপির বন্দর বিভাগের উপ-কমিশনার শাকিলা সোলতানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে চাকরিতে অনুপস্থিত ছিলেন শওকত। নিয়ম অনুযায়ী অনেকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। তিনি চাকরি করবেন না বলে জানিয়েছেন। এ জন্য সব প্রক্রিয়া মেনে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’









