দালালের মাধ্যমে সৌদি গিয়ে নির্যাতনে যুবকের মৃত্যু, লাশ দেশে আনার আকুতি

নোয়াখালী প্রতিনিধি
০৩ জুলাই ২০২৩, ১২:০১আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৩, ১২:০১

‘আমার হানিফরে আমার কাছে আইনা দেন, তাকে আমি প্রাণভরে একবার দেখতে চাই। আমার ছেলে সংসারের বোঝা মাথায় নিতে সৌদি আরব গেছে। আমি তিন জায়গা থেকে কিস্তি নিয়ে তারে বিদেশ পাঠাইছি। তারে বিদেশ পাঠাইতে আমার মেয়ের স্বর্ণ-গয়না বিক্রি করছি। সেখানে আমার ছেলেরে মেরে ফেলছে। তার লাশ আমি কেমনে আনমু? আমি যে তারে একনজর দেখতে চাই।’ বিলাপ করতে করতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের আবদুল্লাহপুর গ্রামের আবদুল মোতালেব।

জীবিকার সন্ধানে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবের আভা শহরে গিয়ে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে তার বড় ছেলে হানিফের (৩৪) মৃত্যু হয়। গত ১৬ জুন রিয়াদের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর সেখানে বসবাসকারী নিকটাত্মীয়রা লাশ দেশে আনার বিষয়ে দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করছে। ফলে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বাড়িতে হানিফের বৃদ্ধ বাবা-মা, ভাই-বোন ও স্ত্রী-সন্তানরা শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন।

তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা হানিফ অভাবের তাড়নায় ছোটবেলা থেকে নির্মাণশ্রমিকের (রাজমিস্ত্রি) কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। চলতি বছরের ১২ মার্চ সৌদি আরবে বসবাসকারী তার বড় বোনের শ্বশুর মোহাম্মদ শহিদ উল্লাহ তাকে সেখানে নিয়ে যান। তাকে রাজমিস্ত্রির কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সে অনুযায়ী এনজিও থেকে লোন নিয়ে ও বোনের স্বর্ণ-গয়না বিক্রি করে শহিদ উল্লাহকে চার লাখ টাকা দেন।

দেশটিতে যাওয়ার পর তাকে রাজমিস্ত্রির কাজ না দিয়ে আভা শহরে ভেড়া চরানোর চাকরি দেওয়া হয়। যে মালিকের অধীন তাকে চাকরি দেওয়া হয়েছিল ওই ব্যক্তি তাকে নানা ধরনের শারীরিক নির্যাতন করতো। বিষয়টি তার আত্মীয় শহিদকে জানানোর পর তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। সেখানে নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৬ জুন রিয়াদের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একইদিন স্থানীয় সময় বিকাল ৩টায় হানিফ মারা যান।

হানিফের ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা চার ভাই এক বোন। হানিফ আমাদের সবার বড়। সংসারের হাল ধরতে তিনি বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি। অল্প বয়সে রাজমিস্ত্রির কাজে জড়িয়ে পড়েন। দেশে থাকতে রাজমিস্ত্রির কাজ করেই সংসার চালাতেন। আমার বৃদ্ধ বাবা-মাসহ সবাই তার আয়ের ওপর নির্ভর ছিলাম। এ ছাড়া তার স্ত্রী ও তিন সন্তানের ভরণপোষণও তিনি করতেন। আমার বোনের শ্বশুরের দেখানো প্রলোভনে পড়ে তিনি সৌদি আরব যান। সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুতে আমাদের পরিবারে অন্ধকার নেমে এসেছে।’

হানিফের বাবা আবদুল মোতালেব কান্না করতে করতে বলেন, ‘আমার সব শেষ। হানিফের স্বপ্ন ছিল, আমাদের ভালো রাখবে। কিস্তি নিয়ে সে বিদেশ যায়। প্রথম দুই মাস বেতনের টাকা বাড়ি পাঠায়। এরপরই তো সে মারা যায়। আমি কিস্তির টাকা কীভাবে শোধ করবো। শুনেছি তার লাশ আনতে অনেক টাকা লাগবো। আমি টাকা পাবো কই? আমি যে আমার ছেলেকে একনজর দেখতে চাই।’ বলেই আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

হানিফের মেঝো ভাই ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মৃত্যুর পর শহিদ উল্লাহকে লাশ দেশে আনার কথা বললে তিনি উল্টো ক্ষেপে যান। এ নিয়ে কাউকে কিছু বললে তিনি আমাদের ক্ষতি করার হুমকি দেন।’

নিহত হানিফের ছোট বোন বিবি মরিয়ম বলেন, ‘আমার ভাই দেশে রাজমিস্ত্রির কাজ করে পরিবার চালাতেন। বৃদ্ধ বাবা-মা ছাড়াও ছোট ভাইয়ের পড়ালেখার খরচ, স্ত্রী আফিয়া খাতুন ও তিন সন্তানের খরচ জোগাতেন। তার বড় ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে, ছোট ছেলে নুরানি মাদ্রাসায় প্রথম জামায়াতে পড়ে। একমাত্র মেয়ের বয়স আড়াই বছর।’

অভিযুক্ত শহিদ উল্লাহর বক্তব্য জানার জন্য সৌদি আরবে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল ও মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি এবং মেসেজের রিপ্লাই দেননি। তাই অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একই উপজেলার দূর্গাপুর গ্রামের বাসিন্দা সহিদ উল্লাহ প্রায় ১৫ বছর ধরে সৌদি আরব বসবাস করছেন। দীর্ঘ এই সময় ধরে তিনি একবারের জন্যও দেশে আসেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াখালী জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবু ছালেক বলেন, ‘নিহত হানিফ যদি বৈধ পথে সৌদি আরব গিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে বিনা খরচে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনাসহ নিয়ম অনুযায়ী সরকারিভাবে দেওয়া ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।’

/এফআর/
সম্পর্কিত
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
হজ পালন শেষে দেশে ফিরেছেন ১৭ হাজার ৬৮৯ হাজি, মৃত্যু ৪২
কুয়েতে ইরানি হামলার নিন্দা সৌদি আরবের
সর্বশেষ খবর
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী