মাছ ধরতে গিয়ে নাফ নদে অপহৃত বাংলাদেশি পাঁচ জেলেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কাছে হস্তান্তর করছে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। বুধবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার জলসীমায় নাফ নদের মাঝখানে টহলরত বিজিবির কাছে নৌকাসহ জেলেদের হস্তান্তর করা হয়।
এর আগে, গত সোমবার মাছ শিকারে যাওয়া জেলেদের একটি নৌকা বিকল হলে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের ধরে নিয়ে যায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি।
বিজিবি জেলেদের নিয়ে টেকনাফ পৌরসভার চৌধুরীপাড়া-সংলগ্ন বাংলাদেশ-মিয়ানমার ট্রানজিট জেটিঘাটে পৌঁছায় পৌনে ২টায়। এ সময় জেটিঘাটে টেকনাফ ২ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল মহিউদ্দীন আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনে জেলেদের ফেরত আনার প্রক্রিয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
আরকান আর্মির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অপহৃত জেলেদের ফেরত আনা হয়েছে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে লে. কর্নেল মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘গত সোমবার বাংলাদেশি পাঁচ জেলে নাফ নদে মাছ শিকার অবস্থায় নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। এ সময় তাদের নৌকা ভেসে মিয়ানমার সীমান্তে প্রবেশ করে। এতে খাইং চং নামক জায়গা থেকে মিয়ানমার বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মি অনুপ্রবেশের দায়ে নৌকাসহ পাঁচ বাংলাদেশি জেলেকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি। একপর্যায়ে আজ দুপুরে আরকান আর্মি বাংলাদেশি জেলেদের হস্তান্তর করলে তাদের ফেরত আনা হয়।’
এক প্রশ্নের জবাবে বিজিবির এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আরকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ বলতে, পার্শ্ববর্তী দেশে সীমান্তে মিয়ানমারে যে সংগঠন থাকুক না কেন, দেশের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে আরকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বাংলাদেশ সীমান্তে বিজিবি ও মিয়ানমার সীমান্তে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে এই পাঁচ জেলেকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তে যেন কোনও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারে তাদের (আরকান আর্মি) সঙ্গেও কথা হয়েছে। যার কারণে সম্প্রতি বাংলাদেশে কোনও ট্রলারের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। এ ছাড়া আমরা প্রতিনিয়ত সীমান্তে অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিহত করছি।’
ফেরত আসা জেলেরা হলেন- রাশেদ হোসেন, মো. বোরহান, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ রাসেল ও মোহাম্মদ আলম।
ফেরত আসা নৌকার মাঝি মো. আলম বলেন, ‘আমরা নাফ নদে মাছ শিকার করতে গিয়েছিলাম,সেখানে স্পিডবোট নিয়ে এসে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আমাদের ধরে নিয়ে গিয়ে মংডুতে তাদের (আরকান আর্মি) একটি ক্যাম্পে রাখা হয়। এ সময় আমাদের মারধর করা হয়। পরে রাত ৩টায় জঙ্গল থেকে পায়ে হাঁটিয়ে আরেকটি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। প্রথমবার মেরেছিল এরপর আর মারেনি। দুই বেলা খাবার দিয়েছিল। সেসব এলাকায় কোনও মানুষজন নেই। এলাকাগুলো নির্জন, চারদিকে খালি (জনশূন্য) দেখা গেছে। অবশেষে এখন দেশে আসতে পেরে খুশি লাগছে।’
আরেক জেলে মো. বোরহান বলেন, ‘মাছ ধরতে গেলে আমাদের নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়, পরে ভেসে মিয়ানমারের কাছাকাছি চলে গেলে আরকান আর্মি এসে ধরে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে মারধরও করে। রাতে আরকান আর্মি ক্যাম্পে আমাদের রাখা হয়। সেখানে জানানো হয়, বিজিবি আমাদের ফেরতের বিষয়ে যোগাযোগ করেছে। এরপর একটু প্রাণে শান্তি পাই। অবশেষে ফেরত এসে খুব ভালো লাগছে।’
মো. আলমের ফেরার কথা শুনে জেটিঘাটে হাজির হন মা জুলেখা বেগম। তিনি বলেন, ‘গত দুই দিন আগে নাফ নদে থেকে মাছ শিকারের সময় পাঁচ জেলেকে নৌকাসহ মিয়ানমারের মগরা (আরাকান আর্মিরা) ধরে নিয়ে যায়। পরে আমরা বিজিবিকে বিষয়টি অবহিত করি। অবশেষে বিজিবির প্রচেষ্টায় তাদের ফেরত পেয়েছি। তাই বর্তমান সরকারসহ বিজিবিকে ধন্যবাদ জানাই।’
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন টেকনাফ ২ বিজিবির মেজর ইশতিয়াক আহমেদ ও মেজর সৈয়দ ইশতিয়াক মুর্শেদ।









