১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের জৈনপুর থেকে আসা এক পীর খানকা স্থাপন করেন। ওই সময় এলাকাটিতে মহামারি আকাকে কলেরা ছড়িয়ে পরে। তখন চলছিল স্থানীয় একটি নির্বাচন। জৈনপুর থেকে আসা পীর ওই সময় ফতোয়া দেন, নারীরা যেন ‘বেপর্দা’ হয়ে ঘর থেকে বের না হন। এতে নির্বাচনে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন পুরো ইউনিয়নের নারীরা। এরপর কেটে গেছে প্রায় ৪৫ বছর। এখনও ভোট দেন না নারীরা। পীরের নির্দেশ মুসলিম নারীদের জন্য হলেও ইউনিয়নের হিন্দু ও খ্রিস্টান নারীরাও ভোট দেন না।
এ ঘটনা ঘটে চলেছে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে।
জানা গেছে, এখানকার নারীরা পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবাধে কাজ করছেন। হাট-বাজার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা সব ক্ষেত্রেই নারীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। শিক্ষার হারেও এখানকার নারীরা পিছিয়ে নেই। এমনকি পুরুষের ভোটে নির্বাচিত হচ্ছেন সংরক্ষিত মহিলা মেম্বারও। বর্তমানে এ ইউনিয়নে প্রায় ৯ হাজার নারী ভোটার রয়েছেন। কিন্তু এখানকার নারীরা শুধু ভোট দেন না প্রায় ৪৫ বছর আগে দেওয়া পীরের ফতোয়ার কারণে।
পারুল রাণি (৬০), লক্ষ্মী রাণি (৫০) ও রুপা রাণি (২২)। এদের বাড়ি ইউনিয়নের চরপাতা গ্রামের ধোপা বাড়িতে। এরা সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী হলেও পীরের ‘নির্দেশ’ মেনে কখনও ভোটকেন্দ্রে যাননি। মুসলিম নারীরা তো যান না। এমনকি খ্রিস্টান নারীরাও ভোট দেন না।
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের লক্ষ্মী রাণি (৫০) বলেন, ‘জৈনপুর হুজুরে বলেছেন ১৬নং ইউনিয়নে মহিলাদের ভোট দিতে হবে না, তাই আমরা ভোট দিতে যাই না।’
পারুল রাণি (৬০) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি কখনও ভোট দেইনি। এ এলাকার কোনও মহিলা ভোট দিতে যায় না, তাই আমিও ভোট দেই না। ’
একই এলাকার রুপা রাণি (২২) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তো কখনও ভোট দেই না। আমাদের একজন হুজুর নিষেধ করেছেন তাই আমরা ভোট দিতে যাই না। সরকারিভাবে এখনও কেউ এসে আমাদেরকে ভোট দিতে বলেননি।’
স্থানীয় যুবক সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুনেছি হুজুরের নির্দেশ অমান্য করে একবার কয়েকজন মহিলা ভোট দিতে গেছিলেন। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে তারা দুর্ঘটনার শিকার হন।’
তবে কারা ভোট দিতে গিয়ে কোথায় দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন, এ বিষয়ে কেউ নিশ্চিত করে কিছু জানাতে পারেননি।
স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এমিলি বেগম বলেন, ‘এ এলাকার নারীরা সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে। তবে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমাদের মা, দাদি-নানিরা ভোট দেন না। তাই ইচ্ছা থাকার পরও আমরা ভোট দিতে পারছি না।’
ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ড. একেএম মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘পর্দার মধ্যে থেকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের ওপর কোনও নিষেধ নেই। এখানকার নারীরা চাইলে পর্দা সহকারে ভোট দিতে পারেন।’
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বিল্লাল খান বলেন, ‘একটি কুসংস্কারে বিশ্বাস করে নারীরা ভোটকেন্দ্রে যান না।’ তিনি মনে করেন, নারীদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হলে রাজনৈতিক সচেতনতা অত্যন্ত প্রয়োজন। স্থানীয় লোকজন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে।
এ ব্যাপারে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়নাল আবদীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসন বিভিন্নভাবে এখানকার নারী ভোটারদের সচেতন করতে এবং ভোটকেন্দ্রে আসতে সচেতনতামূলক সভা-সমাবেশ করেছে। তাছাড়া কয়েকটি এনজিও বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছে। তারা ভোটকেন্দ্রে আসার কথা বললেও ভোটের দিন ভোট দিতে আসেনি।’
নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘এখানকার মানুষ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, পীরের নির্দেশের কথা বলে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মহিলারাই ভোট দিতে কেন্দ্রে আসেন না। তবে আমরা আশাবাদী এবার পরিস্থিতি পাল্টাবে।’
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আতাউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তৃতীয় পর্যায়ে ফরিদগঞ্জের ১৪টি ইউনিয়নে ভোট হবে। এর মধ্যে ফরিদগঞ্জের রূপসা ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে মহিলা ভোট দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কমিশনের পক্ষ থেকে রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে, যাতে মসজিদের ইমামদের সহযোগিতা নিয়ে কিভাবে মহিলাদের ভোটকেন্দ্রে আনা যায় সে ব্যবস্থা নিতে।’
/এএ/ এএইচ/







