২০২৫ সালের ১৪ মার্চ পবিত্র রমজান মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজারের উখিয়ায় শরণার্থীশিবিরে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে ইফতার করেন। ইফতার আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিরাট আশাবাদ। সেই সমাবেশ থেকেই ঘোষণা আসে ২০২৬ সালের ঈদের আগেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। এর মধ্যে এক বছর পেরিয়ে গেছে। ঈদ এখন দুয়ারে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে সেই প্রতিশ্রুতি এখনও অধরাই রয়ে গেছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, কবে শেষ হবে রোহিঙ্গাদের দুর্দশার এই জীবন। কবে ফিরবে নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে, আর কবেই বা সেখানেই ঈদ উদযাপন করবেন তারা।
রোহিঙ্গারা বলছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিশ্রুতির পর ধারণা করা হচ্ছিল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও আঞ্চলিক উদ্যোগের মাধ্যমে হয়তো বহু বছর ধরে স্থবির থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আসবে। কিন্তু এক বছরেও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ না হওয়ায় এখন হতাশ রোহিঙ্গারা। খাদ্য সংকট আর অনিশ্চয়তার মধ্যে টানা নয় বছর ধরে একই বেদনাময় পরিস্থিতিতে ঈদ কাটাচ্ছেন বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা।
কী বলেছিলেন ড. ইউনূস
ওই দিন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছিলেন, ‘তহবিলের কাটছাঁটের ফলে নাটকীয় প্রভাব পড়বে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের অবনতিশীল পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সুনির্দিষ্ট সহায়তা এবং পদক্ষেপের মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে।’
সেদিন আন্তোনিও গুতেরেসের পাশে বসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা যেন আগামী বছর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে জাতিসংঘের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছি।’
অনিশ্চয়তা
রোহিঙ্গা ও তাদের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। প্রত্যাবাসন নিয়ে সরকারিভাবে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি নেই। এদিকে গত প্রায় ১৫ মাসে নতুন করে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এতে ক্যাম্পগুলোতে জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে এবং সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত বছরের ঘোষণাটি রোহিঙ্গাদের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। বহুদিনের দুঃখ-কষ্ট ভুলে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল ফেরার পথ হয়তো এবার খুলবে। কিন্তু এক বছর পর এসে সেই আশার জায়গায় তৈরি হয়েছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা। অনেকেই মনে করছেন, প্রতিশ্রুতি ছিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা, বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল স্পষ্ট।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে। বর্তমানে সেখানে সরকারি বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই সহিংসতার কারণে সেখানে বসবাসরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং অনেকে এলাকা ছাড়ার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রত্যাবাসন স্থবির থাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়ায় খাদ্য সহায়তা হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানি সংকটও দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। অপরাধ, পাচার ও সহিংসতার আশঙ্কাও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করছেন। কারণ নয় বছর পার হলেও একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরানো যায়নি।
বর্তমানে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর রোহিঙ্গাদের মাঝে আবারও একটি সীমিত আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা মনে করছেন, যদি সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে হয়তো দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনের পথে অগ্রগতি সম্ভব।
ঈদের আমেজ নেই রোহিঙ্গাদের মনে
ঈদ এলেও কক্সবাজারের ৩২টি শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের জীবনে উৎসবের কোনও আমেজ নেই। রাখাইনে নির্যাতনের স্মৃতি আর বর্তমানের অভাব-অনটন তাদের ঈদের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
ঈদের প্রস্তুতির কথা জানতে চাইলে টেকনাফের মৌচনী নতুন রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা সৈয়দ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘থাকা খাওয়ার যে অবস্থা সেখানে ঈদের কথা ভাবার সুযোগই নেই। ভালো পানির ব্যবস্থা নেই। বাথরুমের সুব্যবস্থা নেই। এ পরিস্থিতিতে ঈদের দিন আর সাধারণ দিনের পার্থক্য করা যায় না।’ শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে যখন কথাগুলো বলছিলেন, তখন ছেলেটির পরনে পোশাকও ছিল না।
তিনি আরও বলেন, ‘দেখুন, টাকার অভাবে ছোট ছেলেটিকে জামা কিনে দিতে পারিনি, ঈদেও পারবো না। পেটের খাবার তো সবার আগে। খাবার কিনতে পারলেই তো ঈদের আনন্দ হবে।’
উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা নুর আলম বলেন, ‘গত বছরের রমজানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘ মহাসচিব ক্যাম্পে এসে ২০২৬ সালের ঈদ আমরা নিজ দেশ মিয়ানমারে উদযাপন করতে পারব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কাল ঈদ, আমরা ক্যাম্পে রয়ে গেছি। কবে ফিরতে পারবো তাও জানি না। কেউ আমাদের নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারছেন না।’
প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় হতাশা
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০২৬ সালে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা রোহিঙ্গারা নিজ ভূমি আরাকানে উদযাপন করতে পারবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘ মহাসচিব। এমনকি সেখানে ফিরে মা-বাবার কবর জিয়ারতের সুযোগও হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আমরা হতাশ হয়েছি। ওই ঘোষণায় রোহিঙ্গাদের মাঝে ব্যাপক আশার সঞ্চার হয়েছিল। কষ্ট ও দুঃখ কিছুটা ভুলে গিয়েছিল তারা। কিন্তু সময় গড়ালেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে মিথ্যা আশ্বাসের কারণে এবার ঈদ ঘিরে কষ্ট পেয়েছে তারা। তবে নতুন করে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসায় আবারও আশাবাদী হচ্ছি। কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সম্মানজনক প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে বলে বিশ্বাস রাখি।’
ক্যাম্পভিত্তিক সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার নেতা মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের আশ্বাসে প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদী ছিলাম আমরা। তবে শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হয়েছে। বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে যেভাবে দুই দফা প্রত্যাবাসন হয়েছে, সেই নজির আমাদের নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। আমরা চাই, বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের রূপরেখা বাস্তবায়ন করুক।’
রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের বক্তব্যে তার ব্যক্তিগত চিন্তাধারার প্রতিফলন থাকলেও এখনও কোনও বাস্তব ফল দেখা যায়নি। ভবিষ্যতে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। ইতিমধ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তারা যদি সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তাহলে কিছু ইতিবাচক ফলাফল আসতে পারে। তবে এখনও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় এ বিষয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই আমাদের।’
দুই মাস আগে উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা শিবিরে ছেলেসন্তান জন্ম দিয়েছেন ছেনো আরা বেগম। একমাত্র ছেলের প্রথম ঈদে নতুন জামা কিনে দেবেন কীভাবে সেই চিন্তা তার। আরও পাঁচটি মেয়ে রয়েছে ঘরে। ছোনো আরা বেগম বলেন, ‘মিয়ানমারে স্বামী আবদুল হাসিমের তিনতলা কাঠের বাড়ি ছিল। ছিল তিন একর জমিতে চিংড়ি ঘের। এখন সব হারিয়ে ঝুপড়ি ঘরে থাকতে হচ্ছে। গত বছরের ঈদে প্রত্যেক সন্তানকে নতুন জামা দিয়েছিলাম। কিন্তু এপারে আসার পর থেকে নিয়মিত তাদের জন্য খাবার জোগাড় করতে পারছি না।’
রোহিঙ্গা মো. আলী বলেন, ‘ভাবছি একটি মাত্র ছোট ছেলেকে কিছু ত্রাণ বিক্রি করে নতুন জামা কিনে দেবো।’
নেতৃত্বশূন্য রোহিঙ্গারা
এর আগে রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ বড় জমায়েতটি ছিল সাত বছর আগে, ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট। সেবার রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা ঢলের দুই বছর পূর্তিতে উখিয়ার কুতুপালং মধুরছড়া (ক্যাম্প ৪) বিশাল তিনটি মাঠ ও পাহাড়ে জড়ো হয়েছিলেন এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা। ওই সমাবেশের নেপথ্যের ব্যক্তিটি আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান ছিলেন মুহিব উল্লাহ। ওই সমাবেশের প্রায় দুই বছর পর কয়েকজন রোহিঙ্গার গুলিতে তিনি নিহত হন। এরপর কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েন রোহিঙ্গারা।
প্রত্যাবাসনের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রত্যাবাসন ইস্যুতে দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি নেই; বরং পরিস্থিতি দিন দিন আরও অবনতি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইনে সংঘাত বেড়েছে। সরকারি বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান লড়াইয়ের ফলে সেখানে অবশিষ্ট রোহিঙ্গারাও নির্যাতনের মুখে এলাকা ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। এমনকি সীমান্ত এলাকাতেও নতুন করে রোহিঙ্গা জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ থাকলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি নেই। পরিস্থিতি এখনও প্রত্যাবাসনের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। পাশাপাশি সেখানে অবকাঠামো ও আর্থিক সংকটও বিদ্যমান, যা পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। তবে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে।’









