পাহাড়ে আসছেন লাখো পর্যটক, শত কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা

রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
২২ মার্চ ২০২৬, ১০:০১আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৬, ১০:০১

এবার ঈদে লম্বা ছুটি থাকায় সারা দেশ থেকে ভ্রমণপ্রেমীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে আসছেন। ইতিমধ্যে এসব জেলার ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ হোটেল বুকিং দিয়ে রেখেছেন পর্যটকরা। ব্যবসায়ী ও প্রশাসন প্রত্যাশিত ভিড়ের কথা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিয়েছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের ছুটিতে পাহাড়ে পর্যটক একটু বেশি আসবেন। কারণ টানা ছুটি থাকায় ভ্রমণপ্রেমীরা শান্ত, নিরিবিলি ও সমাহিত সৌন্দর্যের মধ্যে কয়েকটা দিন কাটিয়ে যাবেন। তাদের প্রত্যাশা, এই সময়ে ১০০ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্য হবে পর্যটন খাতে। সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা।

রাঙামাটিতে আসছেন লক্ষাধিক পর্যটক

অতীতের মতো এবারের ঈদের ছুটিতে লেক পাহাড়ের শহরে আসছেন লক্ষাধিক পর্যটক। তাদের বরণে প্রস্তুত বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের রুইলুই (সাজেক ভ্যালি) পর্যটনকেন্দ্রের ১১৮টি রিসোর্ট, শহরের অর্ধশতাধিক হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস, রিসোর্ট, হাউসবোট, শতাধিক ট্যুরিস্ট বোট ও শতাধিক রেস্তোরাঁ। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, ঈদের ছুটিতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে।

পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুই মাসে রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক, কাপ্তাই হ্রদ, সুভলং ঝরনা, সাজেক, কাপ্তাইসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ছিল প্রায় পর্যটকশূন্য। রমজান মাসে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ছাড় দিয়েও হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউসগুলোতে প্রত্যাশিত পর্যটক পাওয়া যায়নি। এতে
হোটেল-রেস্তোরাঁর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ট্যুরিস্ট বোট, টেক্সটাইল মার্কেট, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে ঈদের ছুটিতে পরিস্থিতি বদলাবে। কারণ ইতিমধ্যে রিসোর্ট ও কটেজগুলোর ৭০-৮০ শতাংশ কক্ষ বুকড হয়ে গেছে। বাকিগুলোও এরই মধ্যে বুকড হয়ে যাবে। এই ছুটিতে এক থেকে দেড় লাখ পর্যটক আসবেন। এতে চাঙা হবে পর্যটন অর্থনীতি। ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে।

হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট মালিকরা জানিয়েছেন, ঈদের ছুটিতে রাঙামাটিতে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোর ৭০-৮০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। এতে সন্তুষ্ট তারা। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রস্তুত রয়েছে পুলিশ প্রশাসন। তবে গত বছরের তুলনায় এবার পর্যটক সমাগম বেশি হবে। ইতিমধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। তারকা মানের হোটেলগুলোতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। ছুটির দিনগুলোতে শতভাগ কক্ষ বুকিংয়ের আশা হোটেল মালিকদের।

কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ নীল জলরাশি আর সবুজ পাহাড়ের টানে এখানে ছুটে আসেন পর্যটকরা। অনেকের কাছে নতুন আকর্ষণ হাউসবোট। নিরিবিলি পরিবেশ ও কাপ্তাই হ্রদের প্রাণ-প্রকৃতি উপভোগ করতে দ্বীপকেন্দ্রিক রিসোর্টে আগ্রহ বেড়েছে পর্যটকদের। এ ছাড়া পর্যটকদের কাছে অন্যতম গন্তব্য এখন মায়াবীদ্বীপ, রাঙাদ্বীপ, ওয়াইল্ডউড আইল্যান্ড, ডিভাইন লেক আইল্যান্ড, নীলঞ্জনা, লেকভিউ আইল্যান্ড ও দ্য গ্রান্ড হিলতাজ অন্যতম।

মায়াবীদ্বীপ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রিকো খীসা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুধু আমাদের রিসোর্টই নয়, জেলার অধিকাংশ রিসোর্ট প্রায় শতভাগ বুকিং হয়ে গেছে। আমরা এখন পর্যটকদের বরণের অপেক্ষায় আছি।’

একই কথা বলেছেন রাঙাদ্বীপ রিসোর্টের পরিচালক আলোক ব্রত চাকমা। তিনি বলেন, ‘আমাদের রিসোর্টে প্রায় ১২০ জন পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা আছে। ২২ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত শতভাগ বুকিং হয়ে গেছে।’

বার্গি লেক ভ্যালির পরিচালক সুমেত চাকমা বলেন, ‘আমাদের রিসোর্টে ১৮ মার্চ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত শতভাগ কক্ষ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, ঈদে ভালো ব্যবসা হবে। রোজায় পর্যটক ছিল না বললে চলে। এতে অনেকটা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি আমরা। আশা করছি, সেটি পুষিয়ে নিতে পারবো এবার।’

রাঙামাটির অন্যতম আকর্ষণ সাজেক ভ্যালি। দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা এখানে ঘুরতে আসেন। এ বিষয়ে সাজেক রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ বলেন, ‘সাজেকে ২২ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত শতভাগ বুকিং রয়েছে। তবে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে পর্যটকদের যাতায়াতে অসুবিধা হবে কিনা, তা নিয়ে আমরা কিছুটা চিন্তিত।’ 

রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু

রাঙামাটি হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইউছুপ চৌধুরী বলেন, ‘শহরের বেশ কয়েকটি হোটেল-মোটেলে ইতিমধ্যে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বুকিং হয়েছে। পর্যটকদের সেবা ও বরণে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি।’ শহরের পরিচিত রিসোর্টগুলো ইতিমধ্যে শতভাগ বুকিং হয়েছে।’

রাঙামাটি ট্যুরিস্ট পুলিশ সুপার মো. খাইরুল আলম বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে। পর্যটকরা যাতে নিরাপদে রাঙামাটি ঘুরে যেতে পারেন, সেজন্য নৌপথে ও সড়কপথে ট্যুরিস্ট পুলিশের মোবাইল টিম থাকবে। নৌপথে ভ্রমণের জন্য প্রতিটি ট্যুরিস্ট বোটে লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করতে কাজ করা হবে। সেভাবে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি আমরা।’

বান্দরবানেও লাখো পর্যটক আসার আশা

প্রতি বছরের মতো এবার ঈদেও বান্দরবানে পর্যটকদের ভিড় হবে বলে জানালেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ইতিমধ্যে জেলার ৬০ শতাংশ হোটেল বুকিং দিয়ে রেখেছেন পর্যটকরা।

হোটেল-মোটেলগুলোর আগাম কক্ষভাড়ার তথ্য অনুযায়ী, জেলায় পর্যটকের আগমন ঘটবে দুই দফায়। প্রথম দফায় ২০ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত ঈদের বন্ধে পরিবার-পরিজন নিয়ে পর্যটকরা আসবেন। এরপর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের পর শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। এ জন্য ২৬ থেকে ২৮ মার্চও অনেক হোটেল-রিসোর্টে আগাম কক্ষ বুকিং হয়েছে। 

বগালেকের কুটির মালিক লালকিম বম বলেন, ‘১৯ মার্চ থেকে এক নাগাড়ে ২৮ মার্চ পর্যন্ত আমার কুটিরে বুকিং রয়েছে। কিন্তু তেলের সংকটে পানি সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার মোটরসাইকেল আরোহী পর্যটক বুকিং করার সময় তেল পাবেন কিনা, এ নিয়ে আশঙ্কা আছে।’

ওয়াইজংশন এলাকার সাইরু অবকাশ যাপনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের অবকাশ যাপনকেন্দ্রে ৮০ শতাংশ কক্ষ আগাম ভাড়া হয়েছে। সবাই নিজের মালিকানা যানবাহনে আসেন। সেই ক্ষেত্রে তেল না পাওয়া গেলে অনেক পর্যটক ভ্রমণ বাতিল করতে পারেন।’

জেলা শহরের আবাসিক হোটেল-মোটেলগুলোয় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ বুকিং রয়েছে। হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দিন বলেন, ‘জেলা শহরে শতাধিক ছোট-বড় হোটেল-মোটেলে গড়ে ৬০ শতাংশ বুকিং রয়েছে। এখনও বুকিংয়ের সময় রয়েছে। শেষ পর্যন্ত শতভাগ না হলেও ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ হয়ে যাবে।’

এবারের ছুটিতে পাহাড়ে পর্যটক একটু বেশি আসবেন

জেলা পর্যটন পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘এবারে ঈদে ছুটি বেশি হওয়ায় পর্যটকের আগমন বেশি হবে ধরে নিয়ে পর্যটন ব্যবসায়ী, পুলিশ ও প্রশাসন প্রস্তুতি নিয়ে রয়েছে। পর্যটকরা নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারবেন এবং প্রাপ্য সেবা সহজে পাবেন।’

খাগড়াছড়িতেও আসছেন পর্যটকরা 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর খাগড়াছড়িতে বছরজুড়েই নদী, পাহাড় ও ঝরনা দেখতে ভিড় করেন পর্যটকরা। পাশাপাশি সাজেক ভ্যালিতে যাতায়াতের পথ হওয়ায় খাগড়াছড়ি হয়ে বহু পর্যটক যাতায়াত করেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, খাগড়াছড়িতে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৫টি হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে।

মিলনপুর এলাকার গাইরিং হোটেলের ব্যবস্থাপক প্রান্ত ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের সব কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে।’

খাগড়াছড়ি হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘জেলায় পর্যটনকেন্দ্র তুলনামূলক কম হওয়ায় পর্যটকরা বেশি সময় অবস্থান করেন না। বেশিরভাগই সাজেক গিয়ে পরদিন ফিরে এসে খাগড়াছড়ি ঘুরে দ্রুত চলে যান। পর্যটকদের দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে হলে নতুন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।’

আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক কোকোনাথ ত্রিপুরা বলেন, ‘গত বছর বড়দিনের ছুটিতে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ হাজার পর্যটক এখানে এসেছিলেন। এবারের ঈদেও পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছি।’

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র সাজানো হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ফুলকলির হাতির কবরও দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ঈদে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত আছে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
খাগড়াছড়িতে ব্যাপক পর্যটক সমাগম, খুশি ব্যবসায়ীরা
সাগরের সেই ‘মৃত্যুস্থলে’ ভেসে যাচ্ছিলেন চার পর্যটক, উদ্ধার করলো কে?
৫০ শতাংশ ছাড়েও পর্যটক কম, চায়ের দেশ কী আকর্ষণ হারাচ্ছে
সর্বশেষ খবর
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী