২০১৮ সালে হাইকোর্টে কোটা সংস্কারের দাবিতে রিটকারীদের নেতা ও কোটা সংস্কারের পক্ষে প্রত্রিকায় রিপোর্ট করে আলোচিত সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল অদুদকে মূল্যায়ন করার দাবি জানিয়েছেন আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতৃবন্দ, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীসহ অনেকে। তারা বলছেন, কোটা সংস্কারের কারিগর হিসেবে ভূমিকা পালন করলেও অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছেন আবদুল অদুদ। দৈনিক ইনকিলাবে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি দ্য নিউ নেশনে অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু তাকে যথাথত মূল্যায়ন করা হয়নি।
তারা জানিয়েছেন, ৫৬% কোটার কারণে বিসিএস বঞ্চিত হয়ে যিনি ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি হাইকোর্টে কোটা সংস্কারের দাবিতে রিট পিটিশন করেন এবং কোটা সংস্কারের পক্ষে শত শত রিপোর্ট করে আন্দোলনকে গণআন্দোলনে রূপদান করে ছাত্রসমাজের কাছে আলোচিত হন। তার বাসা জুলাই আন্দোলনের অগ্নিগর্ভখ্যাত সাইনবোর্ড এলাকায়। তখন হেলিকপ্টার থেকে করা গুলিতে তিনি মারা গিয়েছেন বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে লাশ দেখতে তার বাসায় ভিড় করেন অনেকে। জুলাই আন্দোলনের শেষ ছয় দিনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনের পক্ষে রেকর্ড ৮৭টি প্রতিবেদন তৈরি করে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশ করেন, যা ছিল উদাহরণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কোথাও তাকে মূল্যায়িত করা হয়নি বলে মর্মাহত তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমতা, মেধাভিত্তিক সুযোগ এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিয়ে জনপরিসরের আলোচনাকে আদালতে রিট দায়েরের মাধ্যমে নতুনভাবে রূপ দিয়েছেন তিনি। একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে গণজাগরণ তৈরিই ছিল যার লক্ষ্য। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলার কাজটি করেছেন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যার মধ্যে অন্যতম আবদুল অদুদ। তার সঙ্গে রিট আবেদনে বাসসের চিফ রিপোর্টার মো. দিদারুল আলম দিদার ও ঢাবির সাবেক ছাত্র আনিসুর রহমান মীর থাকলেও তিনি ছিলেন সংগঠক। রিটের আইনজীবী ছিলেন একলাছ উদ্দিন ভুইয়া।
এ বিষয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি মুখপাত্র ফারুক হাসান বলেন, ‘ডাকসুর সাবেক ভিপি ও বর্তমান সরকারের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে ২০১৮ সালে আমরা যে কোটা সংস্কার আন্দোলন করেছিলাম, তাতে হাইকোর্টে রিট করে আইনি ভিত্তি দিয়েছিলেন সাংবাদিক আবদুল অদুদ। সেই সময়ে কোটা সংস্কারের পক্ষে তার রিপোর্টগুলো আমাদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। যেহেতু কোটা সংস্কার আন্দোলনের রেশ ধরেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান, সেহেতু শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেপথ্যে থেকে আইনি, বৌদ্ধিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলায় অবদান রাখায় বর্তমান সরকারের দায়িত্ব মেধাবী সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল অদুদকে মূল্যায়ন করা।’
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পরিচালক একলাছ উদ্দিন ভুইয়া বলেন, ‘৫৬% কোটার কারণে বিসিএসে বঞ্চিত হয়ে সাংবাদিক আবদুল অদুদ রিট করার উদ্যোগ নিলে আমরা তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করি। ওই সময়ে পরিস্থিতি অনেক কঠিন ছিল। ঢাবির অনেক ছাত্র-তরুণকে তার সঙ্গে রিটের বাদী হতে অনুরোধ করলেও কেউ রাজি হননি। একমাত্র আনিসুর রহমান মীর ছাড়া। আমাদের বন্ধু ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেনের লেখা ছাপার ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সেই সময়ে সাহসী তরুণ আবদুল অদুদ রিটের স্বপক্ষে ও কোটা সংস্কারের পক্ষে শত শত রিপোর্ট প্রকাশ করে আন্দোলনে গণজোয়ার সৃষ্টি করেন। একবার আমার বাসায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা তারেক রহমানের ইন্টারভিউ নেন। ড. আবদুল মঈন খান, ড. আসিফ নজরুল, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ড. এএসএম আতীকুর রহমান, শামসুজ্জামান দুদু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জোনায়েদ সাকী, নুরুল হক নুরসহ তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিদের সাক্ষাতকারধর্মী কোটাবিরোধী অসংখ্য প্রতিবেদন তৈরি ও প্রকাশ করে তিনি যে অবদান রেখেছেন, সেজন্য তাকে মূল্যায়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মনে করি।’
ঢাবির সাবেক ছাত্র মো. আনিসুর রহমান মীর বলেন, ‘কোটা সংস্কারের ইস্যুটিকে গণআন্দোলনে রূপদান করতে ফ্যাসিবাদী সরকারের তোপের সম্মুখে থেকেও এমন কঠিন কাজটিকে কীভাবে মিশন হিসেবে গ্রহণ করতে হয় তা দেখিয়েছেন আমাদের অগ্রজ মোহাম্মদ আবদুল অদুদ।’
তার সম্পর্কে জানতে চাইলে একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও বাসসের সাবেক এমডি গাজীউল হাসান খান বলেন, ‘সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল অদুদ কোটা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার শিকার হয়ে বিসিএসে বঞ্চিত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকে ব্যক্তিগত ক্ষোভে সীমাবদ্ধ না রেখে আইনগতভাবে রিট করার পাশাপাশি ইস্যুটিকে গঠনমূলক উদ্যোগে রূপান্তর করতে নিজের পেশাগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বহু প্রতিবেদন প্রকাশ করে একটি কাঠামোগত সংস্কারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জনস্বার্থে কাজ করার এই রূপান্তর তার গভীর জাতীয় দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশ যখন একটি অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মেধাভিত্তিক শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ধরনের সংস্কারের ভিত্তি নির্মাণে যারা অসামান্য অবদান রেখেছেন তাদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।’
জানা গেছে, একটিতে প্রথম স্থানসহ ঢাবি-রাবি থেকে ভালো ফলাফলসহ ত্রিপল মাস্টার্স করা এবং দুই দশকেরও বেশি সময় ইনকিলাব, নিউ নেশন, আমাদের অর্থনীতি, দেশবাংলা ও আমাদের সময়সহ মূলধারার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে আবদুল অদুদ কোটা সংস্কারের বিষয়টিকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসতে ব্যাপক গণমাধ্যম কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটির চেয়ারম্যান কবি ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মু. নজরুল ইসলাম তামিজী বলেন, ‘মোহাম্মদ আবদুল অদুদ—সময়ের ভেতর থেকে উঠে আসা এক নীরব অথচ দৃঢ় উচ্চারণ। জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটির যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তিনি কেবল একটি পদে অধিষ্ঠিত নন; বরং দীর্ঘদিনের বৈষম্য, অবহেলা ও প্রান্তিকতার প্রশ্নকে চিন্তা ও আইনের আলোচনায় এনে নতুন মাত্রা দেওয়ার প্রয়াসে নিয়োজিত এক সচেতন মননশীল কর্মী। ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের সূচনা ঘটে কিছু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষের হাত ধরে—যারা দৃশ্যমান আন্দোলনের আগেই নির্মাণ করেন তার নৈতিক ভীত। এই প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ আবদুল অদুদের ভূমিকা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আবদুল অদুদের মতো মানুষের নীরব প্রস্তুতি ও বৌদ্ধিক ভূমিকা নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের বৃহত্তর সামাজিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ পূর্বভাষা। তাকে মূল্যায়ন জরুরি।’
মানবাধিকারকর্মী হিসেবে তিনি কতটা জনবান্ধব ও তাকে নিয়ে মানুষের উচ্চ প্রত্যাশা সম্পর্কে মানবাধিকার সম্মিলিত জোটের মহাসচিব এবং সাবেক জেলা ও দায়রা জজ রফিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনের রূপকার সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল অদুদ আমাদের সম্পদ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনে আমাদের ইনস্টিটিউটের সাবেক ও অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র মোহাম্মদ আবদুল অদুদ এমন এক উদাহরণ তৈরি করেছেন, যেখানে সাংবাদিকতা, আইনি সচেতনতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ একত্রিত হয়ে জাতীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে। তার অবদান আমাদেরকে একটি বৃহত্তর স্বীকৃতির সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়—যেখানে সবক্ষেত্রে শুধু সামনের সারির নেতৃত্ব নয়, বরং নেপথ্যের বুদ্ধিবৃত্তিক, কৌশল ও দূরদর্শিতাপূর্ণ চিন্তা ও শ্রম মূল্যায়িত হওয়া উচিত। আমরা বলিষ্ঠভাবে প্রত্যাশা করব, কোটা সংস্কার আন্দোলনের রূপকার সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল অদুদকে যেন জাতীয়ভাবে মূল্যায়ন করা হয়।’
বাংলাদেশ ল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আলী আজগর খান বলেন, ‘বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের নীরব স্থপতি মোহাম্মদ আবদুল অদুদ সাংবাদিকতা, আইনি উদ্যোগ এবং বৌদ্ধিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে জাতীয় চেতনায় পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু কৃতজ্ঞতার প্রকাশ নয়—বরং এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, মেধাভিত্তিক ও প্রগতিশীল সমাজের দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি ও মূল্যবোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কাজ বলে আমি মনে করি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের ইতিহাস এখনও রচিত হচ্ছে। এই ইতিহাসে প্রকৃত অবদানকারীদের যথাযথভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হলে তার গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা আরও সুদৃঢ় হবে। সেই নিরিখে মোহাম্মদ আবদুল অদুদকে এখনও মূল্যায়ণ না করায় আমরা মর্মাহত। বরং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হয় এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে নিযুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
প্রসঙ্গত, মোহাম্মদ আবদুল অদুদ ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের দুবারের নির্বাচিত নির্বাহী সদস্য ও কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম অব ঢাকার নির্বাচিত ১ নম্বর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটির যুগ্ম মহাসচিব। কোটা সংস্কারে আদালতে রিট দাখিলকালে তিনি আমাদের অর্থনীতিতে সিনিয়র সাব-এডিটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।









