কিশোর বয়সে একদিন হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন নুরু মিয়া কাজী। এরপর কেটে গেছে চার দশকেরও বেশি সময়। কোথায় গেলেন, কীভাবে বেঁচে আছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর না পেয়েই অপেক্ষা করতে করতে মারা যান তার বাবা-মা। অবশেষে প্রায় ৪৪ বছর পর হঠাৎ গ্রামের বাড়িতে ফিরে সবাইকে চমকে দিলেন নুরু মিয়া। তাকে ফিরে পেয়ে আনন্দে ভাসছেন ভাই-বোন, স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চরমোহনা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাজীবাড়ির সন্তান নুরু মিয়া ওরফে ইসমাইল হোসেনের বয়স বর্তমানে আনুমানিক ৬০ বছর। তার বাবা আলী আহাম্মদ ও মা মারুফা খাতুন অনেক আগেই মারা গেছেন।
শনিবার (৪ জুলাই) নুরু মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোনো কাজ করতে না পারায় বাবার বকুনি খেয়ে কিশোর বয়সে গ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে যান। দিন-তারিখ ঠিক মনে নেই তার। লেখাপড়াও তেমন জানেন না। স্মৃতি হাতড়ে, নানা ঘটনা মনে করে বের করেছেন, বাড়ি ছাড়ার ৪৪ বছর হয়েছে।
এতদিন কোথায় ছিলেন
বাড়ি ছেড়ে প্রথমে ভারতের কলকাতায় এক মাস ছিলেন। এরপর চলে যান পাকিস্তানে। সেখানে লাহোরে তিন দিন ও তিন রাত কাটান। পরে ইরানের রাজধানীতে তিন বছর ছিলেন। সেখান থেকে তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে তিন মাস থাকার পর আবার ইরানের রাজধানী তেহরানে ফিরে যান এবং সেখানে আরও তিন বছর থাকেন।
পাসপোর্ট না থাকায় ইরানের মিনআপ জেলে আট মাস কারাভোগ করতে হয় তাকে। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ট্রেনে পাকিস্তানে চলে যান। এরপর করাচিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
সেখানেই তিনি দুটি বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রী জমিলা খাতুনের ঘরে দুই ছেলে—মো. ইয়াসিন ও মো. রহিম এবং এক মেয়ে ইকরা। দ্বিতীয় স্ত্রী মোস্তফা খাতুনের ঘরে তিন ছেলে—মো. নুরনবি, মো. আবু বক্কর ও মো. আবদুল শুক্কুর এবং এক মেয়ে কুলসুমা বেগম। বর্তমানে তিনি নদীতে মাছ ধরার কাজ করেন। দুই স্ত্রী ও সাত সন্তানকে নিয়ে ভালো আছেন বলে জানান।
তবে রায়পুরে থাকাকালে কিশোর বয়সে তার একবার বিয়ে হয়েছিল। সেই স্ত্রী ও তার ঘরের সন্তানরা এখন কোথায় আছেন, তা বলতে পারেননি তিনি।
দেশে ফিরলেও স্থায়ীভাবে থাকছেন না নুরু মিয়া। তিন মাসের জন্য এসেছেন তিনি। এরপর আবার পাকিস্তানে তার পরিবারের কাছে ফিরে যাবেন বলে জানিয়েছেন নুরু মিয়া।
এখন কেমন আছেন নুরু মিয়া
বিদেশে কাটানো দীর্ঘ ৪৪ বছরেও জন্মভূমিকে ভুলে যাননি নুরু মিয়া। প্রথমদিকে নিয়মিত চিঠির মাধ্যমে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। অর্থও পাঠাতেন দেশে। কিন্তু পরে নানা কারণে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কয়েক বছর আগে আবার আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার প্রায় ৪৪ বছর পর ফিরে আসেন নিজের গ্রামে।
দেশে ফিরেই প্রথমে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেন নুরু মিয়া। শেষবার তাদের মুখ দেখতে না পারার আক্ষেপ আজও তাড়িয়ে বেড়ায় নুরু মিয়াকে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর আপনজনদের ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। স্বজনেরা তাকে বরণ করে নেন। পরিবারের সদস্যদের চোখে তখন আনন্দের অশ্রু আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের স্বস্তি।
নুরু মিয়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর নিজের মাটিতে ফিরে আসতে পেরে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। দেশের মাটি, মানুষ ও আত্মীয়স্বজনকে অনেক বেশি মিস করেছি। আজ সবাইকে কাছে পেয়ে নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এই পুনর্মিলন শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষের কাছেই একটি আবেগঘন ও স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।’
ছোট ভাই, দিনমজুর নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘ভাইকে পেয়ে আমরা মহাখুশি। তবে মা-বাবা বেঁচে থাকলে আরও খুশি হতেন। কিশোর বয়সে বিয়ে করে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল নুর মিয়া। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। একসময় ধরে নিয়েছিলাম, সে আর বেঁচে নেই। এতদিনর পর তাকে ফিরে পেয়ে আমরাও সমাদর করছি। তবে তিনি আবার পাকিস্তানের করাচিতে চলে যাবেন।’
রায়পুর সুলতান কাজী জামে মসজিদের ইমাম আবদুল কাদির বলেন, ‘হারিয়ে যাওয়া নুর মিয়া এতদিন পর আবার গ্রামে ফিরে আসায় পরিবার, পরিজন ও গ্রামবাসী সবাই খুশি। গত দুই দিন ধরে তিনি সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলছেন, মসজিদেও নামাজ পড়ছেন। বাংলার পাশাপাশি ফারসি ভাষাতেও কথা বলছেন।’
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে দেখছি।’








