প্রাণের চেয়ে ঘরের মায়া বেশি, পাহাড়ধসের মধ্যেও আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছে না মানুষ

নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম
১০ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৭ আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৭

চট্টগ্রামে পাঁচ দিনের টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ঘটছে পাহাড় ধসের ঘটনা। বুধবার (৮ জুলাই) একই দিনে পৃথক পাহাড় ধসে আরও দুই জন মারা গেছেন। এখনও ঝুঁকিপূর্ণভাবে ২৬টি পাহাড় ও আশপাশে কমপক্ষে এক থেকে দেড় লাখ মানুষ বসবাস করছে। যদিও সরকারি হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীর লোকজনের সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৬ হাজারের মধ্যে। ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে এখনও আশ্রয় কেন্দ্রে আনা যাচ্ছে না।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে এখনও ৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি। নগরে ৯৪টি আশ্রয় কেন্দ্র থাকলেও খোলা হয়েছে ১০টি। এগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে এক হাজার ২২২ জন।

জেলা প্রশাসনের হিসাবে নগরের ২৬টি পাহাড়ে ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার বসবাস করে। তবে ২০২৩ সালের পর চলতি বছর পর্যন্ত পাহাড়ে এবং আশপাশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী পরিবারগুলো নিয়ে হালনাগাদ কোনও তালিকা করেনি প্রশাসন।

২৬টি পাহাড়ের মধ্যে ১৬টি সরকারি এবং ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন। এসব পাহাড়ে ৬ হাজার ১৭৫টি পরিবার সরকারি পাহাড়ে এবং ৩৮৩টি পরিবার ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ে বসবাস করছে।

জেলা প্রশাসন এবং পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলো হচ্ছে- আকবর শাহ থানার ফয়’স লেক সংলগ্ন ১ নম্বর, ২ নম্বর ও ৩ নম্বর ঝিল এলাকার পাহাড়, শান্তিনগর পাহাড়, বেলতলি ঘোনা, জঙ্গল সলিমপুর পাহাড়, বায়েজিদ লিংক রোড সংলগ্ন পাহাড়, ফিরোজ শাহ কলোনি পাহাড়, লালখান বাজারের মতি ঝরনা পাহাড়, বাটালী হিল, পোড়া কলোনি পাহাড়, টাংকির পাহাড়, ষোলশহর রেলস্টেশন সংলগ্ন পাহাড়, বিজয়নগর পাহাড়, আমিন জুট মিলস পাহাড়, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, বার্মা কলোনির পাহাড়, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, লেক সিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়, এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির পাহাড়, ইস্পাহানী পাহাড় এলাকা ও সিডিএ অ্যাভিনিউ সংলগ্ন কয়েকটি ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, নগরের আকবর শাহ থানার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল সংলগ্ন পাহাড়ে সবচেয়ে বেশি অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। শুধু এই এলাকাতে ৪ হাজার ৪৭৬টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে, যা নগরের মোট ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের প্রায় ৬৮ শতাংশ।

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তালিকায় ২৬টি পাহাড়ে ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবার বসবাস করার তথ্য রয়েছে। পরিবারপ্রতি গড়ে চার থেকে পাঁচ জন করে বসবাস করলে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার।

চট্টগ্রামে টানা পাঁচ দিনের বন্যায় পাহাড়ধসে নগরী ও জেলায় গত বুধবার দুই শিশু মারা গেছেন। এর মধ্যে সকাল ৯টায় জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম তানভীর নামে এক শিশু মারা গেছে। মৃত তানভীর জঙ্গল সলিমপুরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মহিন উদ্দিনের ছেলে। এ ঘটনায় মাটিচাপা পড়ে শিশুটির পরিবারের আরও কয়েকজন আহত হন। একই দিন দুপুরে নগরের পাঁচলাইশ থানার চশমা হিল এলাকায় পাহাড় ধসে সুমাইয়া আক্তার (১২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদফতর যৌথভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাইকিং করছে। বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। নগরে ৯৪টি আশ্রয় কেন্দ্র থাকলেও খোলা হয়েছে ১০টি। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ১২২২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয় নেওয়া লোকজনকে শুকনো ও রান্না করা খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে অধিকাংশ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে রাজি হচ্ছেন না। ঘরবাড়ি ও মালামাল ফেলে যেতে না চাওয়ায় অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেই অবস্থান করছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান বলেন, ‘শুধুমাত্র নগরে পাহাড় এবং এবং আশপাশের এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে কমপক্ষে এক থেকে দেড় লাখ মানুষ বসবাস করছে। নগরের কাছে জঙ্গল সলিমপুরে কমপক্ষে ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করছে। এর মধ্যে বুধবার পাহাড়ধসে এক শিশু মারা গেছেন। পাহাড়ে কতজন বসবাস করছে, প্রশাসনের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই। তবে এটার সমীক্ষা থাকা প্রয়োজন। তাহলেই প্রকৃত তথ্য বের হয়ে আসতো।’  

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘টানা ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়গুলো এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং যেকোনও সময় আবার ধস নামতে পারে। তাই পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী সবাইকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আরবান হেলথ সেন্টারকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আমরা বারবার মাইকিং করছি, প্রয়োজন হলে চাপ প্রয়োগও করছি, যাতে মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে যায়।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিশেষ টিম দায়িত্ব পালন করছে। প্রতিটি এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে মাঠে কাজ করছেন।’

/এফআর/
সম্পর্কিত
এভারেস্ট জয়ের নেপথ্যে ওয়েলসের যে পাহাড়ি হোটেল
সব ঋতুতেই অনন্য গ্রিস
বিশ্বের সবচেয়ে খাড়া রেলপথে চড়ে পৌঁছে যান ডাইনোসরের উপত্যকায়
সর্বশেষ খবর
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনও কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
দিল্লিতে রাবণ বধ করবেন ইয়ামি, বার্তা দেবেন নারীশক্তির
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
জলরাশির গর্জনময় সৌন্দর্যে মুগ্ধতার অনন্য জগৎ ইগুয়াজু জলপ্রপাত
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন