চলছে সাঁড়াশি অভিযান, ডেভিড ইমন কোথায়?

নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম
২০ জুলাই ২০২৬, ১০:০১আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ১০:০১

চট্টগ্রাম নগরে দুই কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) অফিসে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-পুলিশ। তবে এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন ঘটনার মূলহোতা শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ওরফ মোবারক হোসেন ইমন।

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক নতুন আতঙ্কের নাম ডেভিড ইমন। র‌্যাব ও পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডিডিএন অফিসে হামলায় জড়িতদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। একইসঙ্গে মূলহোতা সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকেও গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। তবে ঘটনার পর থেকে সে আত্মগোপনে আছে।

গত ১১ জুলাই ডিডিএনের স্বত্বাধিকারীকে কল করে ‘ডেভিড ইমন’ নিজের পরিচয় দিয়ে ভয়ভীতি দেখান।  একপর্যায়ে তার কাছে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেন ইমন।

ওই দিন ডেভিড ইমন বলেছিলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা দেবেন। আর প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে দেবেন। না হলে এখন থেকে আমার ছেলেরা ব্যবসা করবে। আপনি আমার ডিটেইলস পুলিশ কমিশনার থেকে জিজ্ঞেস করেন। আমাকে না চিনলে পুলিশ কমিশনারকে আমার নম্বরটা দেখাইয়েন। ব্যবসা এখন থেকে আমরা করবো। আপনারা করিয়েন না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে স্মার্ট গ্রুপের মুজিবের ঘরে কী হয়েছিল ওটা দেখেছেন তো। মুজিব থেকে গিয়ে আমার কথা জিজ্ঞেস করেন। তাহলে বুঝবেন।’

এর ধারাবাহিকতায় ১৩ জুলাই দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট থেকে ১২টা ৩০ মিনিটের মধ্যে চকবাজার থানার মনুমিয়াজী লেন, চন্দনপুরা এলাকার মরিয়ম হাইটস ভবনের তিনতলায় অবস্থিত ডিডিএনের কার্যালয়ে ৩০-৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা চালায়। হামলাকারীরা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অফিসের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন, আসবাবপত্র, কাচের দরজাসহ বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর করে। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এ সময় হামলাকারীরা অফিসের ড্রয়ারে থাকা ৪৭ হাজার টাকা, তিনটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, একটি ক্যানন প্রিন্টার এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আরিফুল ইসলামের কাঁধের ব্যাগ নিয়ে যায়। ওই ব্যাগে কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ছিল। এ ঘটনায় চকবাজার থানায় একটি মামলা করা হয়।

ডেভিড ইমন ওরফ মোবারক হোসেন ইমন

এ ঘটনার পর পুলিশ এবং র‌্যাব দুই দফায় ডিডিএন অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও লুটের ঘটনায় জড়িত ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে। এর মধ্যে গত ১৪ জুলাই রাতভর অভিযান চালিয়ে আট জনকে গ্রেফতার করে চকবাজার থানা ও ডিবি পুলিশ।

গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন- মো. ইউনুস (৪১), ইমরান হোসেন (৩১), আকবর হোসেন (২৪), মো. সুমন (২৭), মনির ওরফে কেহেরমান (৩৮), গিয়াস উদ্দিন (২১), নয়ন (২০) এবং মোহাম্মদ আবদুল নাহিদ ওরফে ফরহাদ (২৮)। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

একই ঘটনায় জড়িত আরও নয় জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। শনিবার (১৮ জুলাই) রাতভর নগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন- মাইকেল রোহেন মিয়া ওরফে মাইকেল (৩১), মো. তুহিন (২২), আকবর হোসেন (৩৮), মো. আব্দুল মুমিন (৩০), মো. মাসাদ মিয়া (২৭), মো. দিদার মিয়া (২২), মো. সানজাত হাসান (১৮), সৈরত হোসেন (১৮) এবং মো. সাইফুদ্দিন (৩২)।

এ ব্যাপারে র‌্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ডিডিএন কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর ও লুটের ঘটনায় জড়িত নয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ডেভিড ইমনের নির্দেশে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞেসাবাদেও জানিয়েছে, ডিডিএন কার্যালয়ে হামলার দুই দিন আগে মালিককে ফোন করে ডেভিড ইমন দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। চাঁদা না দেওয়ার কারণে এ হামলা চালানো হয়।’

তিনি বলেন, ‘ডেভিড ইমনের নির্দেশে সানি, মাইকেল ও রাজু এই তিন ব্যক্তি রাউজান, বাকলিয়া, চকবাজার ও বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কিছু লোকজন সংগ্রহ করে। হামলাকারীরা প্রথমে বাসে করে বহদ্দারহাটে আসে। এরপর একাধিক অটোরিকশায় করে বাকলিয়া এক্সেস রোডে যায়। সেখান থেকে ছোট একটি দলকে তারা বাকলিয়া এক্সেস রোডে রাখে। যাতে তারা র‌্যাব-পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আসছে কিনা, তা নজরদারিতে রাখে। আরেকটি গ্রুপ ডিডিএন ভবনের আশপাশে মানুষের সঙ্গে মিশে থাকে। পরবর্তীতে যাতে প্রয়োজন হলে তারা সেখানে পৌঁছাতে পারে। ডিডিএন অফিসে হামলা করে ২০ জনের একটি দল। মূলহোতা ডেভিড ইমন আত্মগোপনে আছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-পুলিশ

হামলার শিকার প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার এক সপ্তাহ পরও মূলহোতা ডেভিড ইমনকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। আমি চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জোর দাবি জানাচ্ছি।’

কে এই ডেভিড ইমন

ডেভিড ইমন ওরফ মোবারক হোসেন ইমন ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ সাতটি মামলার আসামি। ইমন অন্তত ১৫-২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন- এমন তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তার ছিল।

বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুজন। তাদের একজন ডেভিড ইমন। এর আগে দেশে এই দলের নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকায় ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন। রায়হানের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত আটটি মামলা আছে।

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন তার হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছে। ডেভিড ইমন বা মোবারক হোসেন ইমন এর আগেও একাধিকবার বিভিন্ন ব্যক্তি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে ফোনে চাঁদা দাবি করেছে। চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ডেভিড ইমন এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে।

/এনআই/এএম/
সম্পর্কিত
রাজধানীতে ময়লার ব্যবসার বিরোধে গুলি, বান্দরবানের রিসোর্ট থেকে গ্রেফতার ৩
ডিএমপির অভিযানে একদিনে ৪৬০ জন গ্রেফতার, মিরপুরে সবচেয়ে বেশি
এনসিপি নেতার প্যান্টের পকেটে ৮টি ইয়াবা পেলো পুলিশ, পরে কারাগারে
সর্বশেষ খবর
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
শরিকদের দূরে যেতে দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী: মান্না
শরিকদের দূরে যেতে দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী: মান্না
প্রতিবেশীর ঘরে ৫ বছরের শিশুর লাশ, ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ
প্রতিবেশীর ঘরে ৫ বছরের শিশুর লাশ, ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ
মিয়ানমারের এক সেনাসদস্য ও দুই পুলিশকে গ্রেফতার করেছে বিজিবি
মিয়ানমারের এক সেনাসদস্য ও দুই পুলিশকে গ্রেফতার করেছে বিজিবি
সর্বাধিক পঠিত
পরবর্তী ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক কারা, জেনে নিন সূচি ও নতুন ফরম্যাট
পরবর্তী ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক কারা, জেনে নিন সূচি ও নতুন ফরম্যাট
কোচের পাঁচ ভুলেই বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয়
কোচের পাঁচ ভুলেই বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয়
ইলিশের জালে ধরা পড়ছে বড় বড় পাঙাশ, দামও কম
ইলিশের জালে ধরা পড়ছে বড় বড় পাঙাশ, দামও কম
মেসির অবসর নিয়ে ম্যাচ শেষে যা বললেন আর্জেন্টিনার কোচ
মেসির অবসর নিয়ে ম্যাচ শেষে যা বললেন আর্জেন্টিনার কোচ
বিশ্বকাপে কোনও গোল-অ্যাসিস্ট না করেও গোল্ডেন বল পেলেন রদ্রি
বিশ্বকাপে কোনও গোল-অ্যাসিস্ট না করেও গোল্ডেন বল পেলেন রদ্রি