কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মামলার এজাহারে যাকে ‘সোনা মিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, কারাগারে থাকা ব্যক্তি বলছেন, তিনি ওই মামলার আসামিই নন। পুলিশের তদন্তেও উঠে এসেছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের পর গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
কীভাবে ঘটলো এমন ঘটনা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতারের সময় মূল অপরাধী সোনা মিয়ার পকেটে নিজের ‘জন্মনিবন্ধন’ সনদে ব্যবহার করা নাম-ঠিকানাসহ একটি হাতে লেখা কাগজ পাওয়া যায়। সেখানে নিজের উল্লেখ করলেও ঠিকানা দিয়েছিল আরেক সোনা মিয়ার। ওই নাম-ঠিকানা অনুযায়ী পুলিশ মামলার এজাহার তৈরি করেছিল। এরপর মূল অপরাধীকে কারাগারে পাঠানো হয়। কিছুদিন পর জামিনে বের হয়ে পালিয়ে যায় ওই মাদক কারবারি। পলাতক অবস্থায় মামলার রায়ের মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন দিনমজুর সোনা মিয়া; যিনি এখন কারাগারে রয়েছেন। ওই নিরীহ দিনমজুর হয়ে যান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
দিনমজুর সোনা মিয়ার পরিবারের দাবি, কারাগারে থাকা ব্যক্তি সম্পূর্ণ নির্দোষ। তার নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে আড়াল করেছেন। কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আমার স্বামী একজন খেটে খাওয়া মানুষ। তিনি কখনও কোনও অপরাধ করেননি, জেলেও যাননি। রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে কুতুবদিয়াপাড়ায় তার পরিচয় ছিল। অথচ আজ সেই রমজানের অপরাধের খেসারত দিতে গিয়ে আমার স্বামী মৃত্যুদণ্ডের আসামি হয়ে কারাগারে। আমি এ ঘটনার সুরাহা চাই।’
পুলিশ জানায়, গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর ওই দিনমজুর আদালতে আবেদন করে জানান, তিনি এই মামলার আসামি নন। পরে আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ তদন্ত করে গত ৫ জুলাই প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম মো. রমজান। তিনিই নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। আর বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়া এই মামলার আসামি নন।
কে দিলেন এমন চার্জশিট
আদালত সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার সদর থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়ার’ (পিতা: মৃত নজির আহমদ, ঠিকানা: কুতুবদিয়াপাড়া, কক্সবাজার ও গর্জনিয়া, রামু) নাম উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন ডিবির পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানস বড়ুয়া আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কিন্তু এরপরও সোনা মিয়ার নাম আসামির তালিকায় থেকে যায়।
পুলিশ বলছে, বিষয়টি জেল কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর আদালতের আদেশে পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করেছে। ইতিমধ্যে পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন জমা দাখিল করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল অপরাধীর দেওয়া মিথ্যা তথ্যের কারণে তার পরিবর্তে দিনমজুর সোনা মিয়া ভুক্তভোগী হয়েছেন। এ ব্যাপারে জানতে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা মানস বড়ুয়ার মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।
সোনা মিয়াসহ পাঁচ জনের মৃত্যুদণ্ড
আদালত সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালত এই মামলায় সোনা মিয়াসহ পাঁচ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পলাতক আসামি সোনা মিয়ার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে র্যাব-১৫ রামু থেকে সোনা মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। এরপর গ্রেফতার সোনা মিয়া আদালতে আবেদন করে জানান, তিনি এই মামলার আসামি নন এবং ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়ে কখনও কারাগারেও যাননি। আদালত বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন।
প্রকৃত আসামির নাম রমজান
গত ৫ জুলাই কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তার বয়স তখন ছিল ২৫ বছর। আর সোনা মিয়ার বয়স ৩৪ বছর। রমজানই নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়ে নকল জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করেছিলেন।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, রমজান ও সোনা মিয়া একসময় রোহিঙ্গা শিবিরে এবং পরে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস করতেন। সেই সুবাদে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্য রমজান জানতে পারেন। তা ব্যবহার করে রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন।
পুলিশের তদন্তে দুই সময়ের কারাগারে সংরক্ষিত তথ্যেও অমিল পাওয়া গেছে। ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ভুয়া সোনা মিয়ার পিতার নাম মৃত নজির আহমদ। তার মায়ের নাম সোনারা বেগম, স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি এবং বয়স ২৫ বছর। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে দুই গাল ও ডান বাহুতে ক্ষতচিহ্ন থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়ার বয়স ৩৪ বছর। তার পিতার নাম মৃত নজির আহমদ হলেও মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন ও স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহু, পেটের বাঁ পাশে ও পিঠের মাঝখানে তিল থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মো. আলী সম্প্রতি জেলা কারাগারে গিয়ে আগে গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া (আসলে রমজান) এবং সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়ার সংরক্ষিত ছবি, শনাক্তকরণ চিহ্ন ও আঙুলের ছাপের মধ্যে মিল পাননি। একই মামলায় গ্রেফতার হওয়া আরেক আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও পুলিশ জানতে পারে, তিনি বর্তমান সোনা মিয়াকে চেনেন না। তদন্তে আরও উঠে আসে, বর্তমান সোনা মিয়া আগে কখনও গ্রেফতার হননি বা কারাগারে বন্দি ছিলেন না।
ঠিকানা ও তথ্যে গরমিল
আদালত থেকে পাওয়া মামলার নথিপত্রের তথ্যমতে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই সময়ের ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২ নম্বর আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি।
এর আগে ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ (আসলে রমজান) কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর আত্মগোপনে চলে যান। এর মধ্যে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আদালত ওই মামলায় সোনা মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব-১৫-এর একটি দল চকরিয়ার ডুলাহাজারা থেকে দিনমজুর সোনা মিয়াকে গ্রেফতার করে। পরে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
কারাগারে যাওয়ার তিন দিন পর দিনমজুর সোনা মিয়া জেল সুপার বরাবর আবেদন করে জানান, তিনি এই মামলার আসামি নন। পরে জেল সুপার ইতিপূর্বে ওই মামলায় জামিনে বের হওয়া আসামি সোনা মিয়ার সঙ্গে বর্তমানে কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার ছবি, ফিঙ্গার প্রিন্ট, ঠিকানা ও তথ্যের গরমিল খুঁজে পান। এরপর জেল সুপার বিষয়টি জেলা ও দায়রা জজের কাছে লিখিতভাবে জানান। আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। গত ২ জুলাই পুলিশ আদালতে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। যেখানে উঠে এসেছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার এবং কারাগারে গিয়ে পরে জামিনে মুক্ত হওয়া সোনা মিয়া আর পরে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। প্রথমে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান।
যা বলছেন ওসি
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘কারাগারে থাকা সোনা মিয়া প্রকৃত আসামি নন। প্রকৃত আসামি রমজান। এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের ওপর আদালতের কোনও আদেশ এখনও পাওয়া যায়নি। আদেশ পেলে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো।’
তদন্ত হওয়া উচিত বলছেন আইনজীবী সমিতির সভাপতি
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মন্নান বলেন, ‘এই মামলার তদন্ত থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতি ছিল। অন্য ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন যাচাই না করেই অভিযোগপত্র দেওয়ায় প্রকৃত আসামি রমজান পালিয়ে গেছে এবং নিরপরাধ সোনা মিয়া কারাগারে বন্দি রয়েছেন। এটি অত্যন্ত অমানবিক। এ ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত।’









