বিদেশি বিনিয়োগে প্রথম টার্মিনাল নির্মাণ শুরু, অর্থনীতিতে নতুন মাইলফলক

নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম 
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়ার চরে বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। গত রবিবার লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর মধ্য দিয়ে লালদিয়া টার্মিনাল হচ্ছে অর্থনীতির নতুন মাইলফলক। ডেনমার্কের মায়ের্সক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস এই টার্মিনাল নির্মাণে ৭৬ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। বর্তমান বিনিময় হার বিবেচনায় যা প্রায় ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।

কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে লালদিয়া চর এলাকায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে, গুপ্তা বাঁকের পরবর্তী এলাকায় এই টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের মোট জায়গা ৪৯ দশমিক ১৫ একর। গত বছরের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালসের এ সংক্রান্ত চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় গত ২২ এপ্রিল লালদিয়ার ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমি এপিএমকে বুঝিয়ে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। 

নকশা প্রণয়নের পর এবার শুরু হলো নির্মাণকাজ। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা আছে। ২০৩০ সালে চালু হবে টার্মিনাল। একটানা ৩০ বছর এটি পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এপিএম টার্মিনালসের এই প্রকল্পে লোকাল পার্টনার হিসেবে আছে দেশীয় কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড।

চুক্তির সময় লালদিয়া টার্মিনালে ৫৫ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের কথা জানিয়েছিল এপিএম টার্মিনালস। এখন প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৭৬ কোটি ডলারে। এই বিনিয়োগে টার্মিনাল অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হবে। প্রায় ৬১৩ মিটার দীর্ঘ টার্মিনালে ৭টি আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ প্রায় ৮০ ধরনের যন্ত্রপাতি থাকবে। যন্ত্রপাতির বড় অংশ জ্বালানির পরিবর্তে বিদ্যুতে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

জার্মানভিত্তিক পরামর্শক হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালে বছরে প্রায় ৩৫ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা রয়েছে। লালদিয়া চালু হলে আরও ৯ লাখ একক কনটেইনারের সক্ষমতা যুক্ত হবে। তাতে বন্দরের মোট সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে বছরে প্রায় ৪৪ লাখ একক কনটেইনার।

বড় জাহাজ ভেড়ানোয় লালদিয়া টার্মিনালের বড় সুবিধা এর অবস্থান। সাগর থেকে কর্ণফুলী নদীর উজানে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোতে যেতে জাহাজকে তিনটি বাঁক অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্যে গুপ্ত বাঁক সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। লালদিয়ার অবস্থান এই বাঁকের আগে, সাগর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে।

বর্তমানে বন্দরের মূল টার্মিনালগুলোতে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফট এবং ২ হাজার ৮০০ একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যায়। এপিএম টার্মিনালসের তথ্য অনুযায়ী, লালদিয়ায় সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের প্রায় ৬ হাজার একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যাবে। ৬১৩ মিটার দীর্ঘ জেটিতে একসঙ্গে ৩টি তুলনামূলক ছোট জাহাজ অথবা দুটি বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ থাকবে। নৌপথের অবস্থানের কারণে রাতেও জাহাজ চলাচলের সুবিধা বাড়বে বলে মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। 

প্রকল্পটি ডিজাইন, নির্মাণ, অর্থায়ন, পরিচালনা ও হস্তান্তর (ডিবিএফওটি) ভিত্তিক গ্রিনফিল্ড প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ বছর। এর মধ্যে নির্মাণকাল তিন বছর এবং পরিচালনাকাল ৩০ বছর। চুক্তিতে উল্লেখিত শর্তগুলো এপিএম টার্মিনালস যথাযথভাবে পালন ও পূরণ করলে পরবর্তী সময়ে আরও ১৫ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। 

প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, মোট ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমির মধ্যে ব্লক-সি এলাকায় ৩২ একর জায়গায় মূল টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। ব্লক-বি এলাকায় প্রায় ৭ দশমিক ১৫ একর জমি কনটেইনার ইয়ার্ড হিসেবে এবং ব্লক-এ এলাকার প্রায় ১০ একর অংশ ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধার জন্য ব্যবহৃত হবে।

প্রস্তাবিত টার্মিনালের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে ৮ লাখ টিইইউস (২০ ফুট সমমান)। গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) চট্টগ্রাম বন্দর ৩৫ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। নির্মাণাধীন লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে ৬১৬ মিটার দীর্ঘ একটি একটানা জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নকশা অনুযায়ী ৬১৩ মিটারের জেটিতে ভিড়তে পারবে ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফট ও ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার বড় জাহাজ।

তবে টার্মিনাল নির্মাণে সরাসরি অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে না চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে; বরং টার্মিনাল পরিচালনা থেকে নির্ধারিত হারে অর্থ পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। চুক্তি অনুযায়ী, বছরে প্রথম ৮ লাখ একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো পর্যন্ত প্রতিটির জন্য এপিএম টার্মিনালসের কাছ থেকে ২১ ডলার করে পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ পর্যন্ত প্রতিটি কনটেইনারের জন্য পাওয়া যাবে ২৩ ডলার। টার্মিনাল চালুর আগে এককালীন ফি হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে ২৫০ কোটি টাকা। 

বন্দর ব্যবহারকারীরা সরাসরি এই আর্থিক আয়ের চেয়ে বন্দরের সক্ষমতা ও সেবায় প্রতিযোগিতা তৈরির বিষয়টিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল হচ্ছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। এ টার্মিনালে বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১০ লাখ টিইইউস। যদিও বর্তমানে ১২ লাখ টিইইউএস হ্যান্ডলিং হচ্ছে। এনসিটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড। বাকি তিন কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি), চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বশেষ নির্মিত টার্মিনাল পিসিটি। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর এ টার্মিনালের উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে এ টার্মিনাল পরিচালনা করছে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে।  

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‌‘সরকারের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের লালদিয়ায় এপি মুলারের টার্মিনাল নির্মাণ বড় মাইলফলক। চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি লজিস্টিক হাব (বাণিজ্য ও পরিবহনকেন্দ্র) হয়ে উঠবে। লালদিয়া প্রকল্প ছাড়াও আমরা বঙ্গোপসাগরের উপকূলরেখাজুড়ে আরও বেশ কয়েকটি বড় বন্দরসুবিধা, প্রকল্প ও লজিস্টিক সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা করছি।’

লালদিয়া টার্মিনালকে স্বাগত জানিয়ে দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘বিশ্বের সেরা একটি কোম্পানি বাংলাদেশে গ্রিন ফিল্ড প্রজেক্ট করছে এটা আমাদের জন্য গৌরবের। আমি সবসময় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই। বাংলাদেশে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্টকেও (এফডিআই) স্বাগত জানাই।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়ত হামিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের পঞ্চম কনটেইনার টার্মিনাল। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর আরও চারটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করেছে। নতুন এই কনটেইনার টার্মিনাল তৈরির মধ্য দিয়ে অর্থনীতির নতুন এক মাইলফলক তৈরি হবে।’

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
পতেঙ্গায় নতুন কনটেইনার টার্মিনাল, ভিত্তিপ্রস্তর আজ
চট্টগ্রামে গণপরিবহন সংকট: বিআরটিসির ৭২ বাস থাকলেও সেবা পাচ্ছে না নগরবাসী 
২০৩০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামকে টপকাবে বাংলাদেশ: আইএমএফ
সর্বশেষ খবর
রেকর্ড ভেঙে ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে ম্যানচেস্টার সিটিতে আর্জেন্টিনার এনজো
রেকর্ড ভেঙে ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে ম্যানচেস্টার সিটিতে আর্জেন্টিনার এনজো
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যু
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যু
চিকিৎসাধীন বিদ্যুৎমন্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি
চিকিৎসাধীন বিদ্যুৎমন্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি
 চ্যাটজিপিটি-গ্রকের বিশেষ সামরিক সংস্করণ চালু করলো পেন্টাগন
 চ্যাটজিপিটি-গ্রকের বিশেষ সামরিক সংস্করণ চালু করলো পেন্টাগন
সর্বাধিক পঠিত
নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেসব সুবিধা পাবেন
নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেসব সুবিধা পাবেন
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে প্রণোদনা পাবেন বাড়িওয়ালা, প্রজ্ঞাপন জারি
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে প্রণোদনা পাবেন বাড়িওয়ালা, প্রজ্ঞাপন জারি
আজ স্বর্ণের দাম কত
আজ স্বর্ণের দাম কত
শাবানা আপার নামে কোনও অভিযোগ নেই, অভিযোগ তার স্বামীর বিরুদ্ধে
শাবানা আপার নামে কোনও অভিযোগ নেই, অভিযোগ তার স্বামীর বিরুদ্ধে
দারুওয়ালা থেকে পুনাওয়ালা: পার্সিদের পদবি এত বিচিত্র কেন
দারুওয়ালা থেকে পুনাওয়ালা: পার্সিদের পদবি এত বিচিত্র কেন