কুমিল্লার কোটবাড়ির বাসায় শুক্রবার জুমার নামাজের পর ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নিজের হাতে খাইয়েছিলেন বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। ছেলের পরনে ছিল পাঞ্জাবি। বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে বাইরে না গিয়ে তার সঙ্গে বসে সিনেমা দেখুক। বলেছিলেন, ‘বাইরে যেও না, মুভি দেখি। তোমার জন্য ভালো একটা গিফটও আছে।’ কিন্তু বাবার সেই আবদার রাখতে পারেনি ১৩ বছরের অপ্রতিম। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলে মায়ের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে বেরিয়ে যায় সে। সেটিই যে ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়ে থাকবে, তা তখন জানতেন না বাবা।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকালে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। এর কিছুক্ষণ আগে তার বাসায় আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী।
কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের বাবার বর্ণনায় উঠে আসে আগের দিন শুক্রবার ছেলের সঙ্গে শেষ স্মৃতিটুকু। তিনি জানান, এদিন বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। সে কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে; এ কথা বলে মাকে জানিয়ে হাসিমুখেই বের হয়েছিল। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার তখনও আশা করছিলেন, ছেলে রাত ৮টার মধ্যেই ফিরে আসবে। কিন্তু ৮টা পেরিয়ে গেলো, ৯টা বাজলো, অপ্রতিম আর ফিরলো না। তখনই উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে পরিবারের।
ছেলেকে খুঁজতে প্রথমে স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তারা। পরে পুলিশ ফাঁড়ি ও সদর দক্ষিণ মডেল থানায় যান। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেন এবং সাধারণ ডায়েরি করেন। রাত বাড়তে থাকে, কিন্তু অপ্রতিমের কোনো সন্ধান মেলে না। রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে আশপাশের দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ দেখার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু অনেক দোকান তখন বন্ধ। পুলিশের কর্মকর্তারা জিয়াউর রহমান ও সাইফুল তাদের অপ্রতিমের বন্ধুদের খুঁজে দেখতে বলেন। এরপর একে একে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ আর সিসিটিভি ফুটেজ দেখা শুরু হয়।
এক বন্ধু জানায়, নামাজের পর অপ্রতিমকে সে রিকশায় যেতে দেখেছে। তার হাতে ছিল মোবাইল, সে আইসক্রিম খাচ্ছিল। সেই তথ্য ধরে রাতভর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ চলে। খানবাড়িসহ আরও কয়েকটি জায়গায় খোঁজা হয়। রাত পেরিয়ে ভোর হলেও থামেনি সেই খোঁজ। সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের চলাচলের পথও খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে একজন রিকশাচালকের সন্ধান পাওয়া যায়। অপ্রতিমের পরনে থাকা পোশাক ও টুপির সঙ্গে মিল থাকা একজন যাত্রীকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে নামিয়ে দেওয়ার কথা জানান। এরপর আরও সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হয়।
অপ্রতিমের মোবাইলের অবস্থানও খোঁজা হচ্ছিল। সামাজিক বনাঞ্চলের দিকে অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পর সেখানে তন্ন তন্ন করে খোঁজ শুরু হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। রাতভর ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে একসময় বাবা স্ত্রীকে শুধু বলেছিলেন, ‘ফিরে আসবে।’ সেই আশাটুকু আঁকড়ে ধরেই রাত কেটেছে তাঁদের।
কিন্তু শনিবার সকালে সেই অপেক্ষার শেষ হয় এক ভয়াবহ খবরে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়া যায়। প্রায় ২০ ঘণ্টা পর যে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন বাবা-মা, তাকে আর জীবিত অবস্থায় ফিরে পাননি তাঁরা।
ছেলের মরদেহ পাওয়ার পর বাবার কণ্ঠেও যেন জমে থাকা রাতভর আতঙ্ক আর শোক একসঙ্গে বেরিয়ে আসে। কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমাদের একটাই ছেলে। অন্যায় করলে ওরে মেরে ফেল, অন্যায় করে নাই। ওর ফোন নিয়ে... ফোনটা নেওয়ার জন্য ওকে মেরে ফেললো, এটা কী হলো?’
অপ্রতিম নিয়মিত নামাজ পড়ত, বন্ধুদের সঙ্গে নামাজ পড়তে যেতো, এ কথাও জানান বাবা। তার ধারণা, অপ্রতিমের পরিচিত বা সিনিয়র কেউ তার সরলতার সুযোগ নিয়ে ছবি তোলা কিংবা একসঙ্গে খাওয়ার কথা বলে তাকে ডেকে নিতে পারে। তবে এটি তার নিজের ধারণা, বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
ছেলেকে হারিয়ে এখন তার একটাই চাওয়া, এই ঘটনার বিচার। বাবা বলেন, ‘এটার বিচার চাই। বিচার চাই যেন নেক্সট এমন না হয়। যারা এগুলার সাথে জড়িত তাদের আমরা ফাঁসি চাই। এবং পরবর্তী সময়ে এমন যেন এই কেউ করতে সাহস না পায়।’
শুক্রবার দুপুরে যে ছেলেকে নিজের হাতে খাইয়ে বাবা বলেছিলেন, ‘বাইরে যেও না, মুভি দেখি’, কয়েক ঘণ্টা পর সেই ছেলেকেই খুঁজতে রাতভর ছুটতে হয়েছে তাঁকে। আর শনিবার দুপুরে ফিরে এসেছে অপ্রতিম, তবে সেই চেনা মুখ আর হাসি নিয়ে নয়, নিথর হয়ে।









