তিন-তিনবার বদলির সুনির্দিষ্ট আদেশ জারির পরও নানামুখী চাতুর্য ও অদৃশ্য খুঁটির জোরে দীর্ঘদিন চেয়ার আঁকড়ে থাকার পর অবশেষে তল্পিতল্পা গুটিয়ে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বিতর্কিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) জসিম উদ্দিন।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নানা নাটকীয়তার পর তার সাদুল্লাপুর কর্মস্থল ত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। স্থানীয় ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ছিল সাদুল্লাপুরে এই কর্মকর্তার শেষ কর্মদিবস। অফিসের প্রধান কর্মকর্তার কাছে তড়িঘড়ি করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তিনি ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে যোগ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে বিদায়বেলায় তার বিরুদ্ধে খাস জমি আত্মসাৎ, রাজনৈতিক ফায়দা লোটা, সাংবাদিক হেনস্তা, সরকারি গাড়ির অপব্যবহার এবং ড্রেজার চুরির মতো পাহাড়সম কেলেঙ্কারির অভিযোগ রেখে গেছেন।
৩৮তম বিসিএস ক্যাডারের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ ওঠার পর প্রথম দফায় গত ২০ এপ্রিল তাকে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়। কিন্তু সেই আদেশ তোয়াক্কা না করে তিনি স্বপদেই বহাল থাকেন। এর পর সাংবাদিক হেনস্তার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে গত ২৪ জুন দ্বিতীয় দফায় তাকে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় বদলি করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই আদেশও ঝুলে থাকে এবং তিনি সাদুল্লাপুরেই অনিয়মিতভাবে অফিস করতে থাকেন।
সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হলে অবসান ঘটে দীর্ঘ নাটকের। অবশেষে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-২ শাখা থেকে ৩৬ জন এসিল্যান্ডের সঙ্গে তালিকার ১ নম্বর বদলির আদেশে থাকা জসিম উদ্দিন বুধবার কর্মস্থল ছাড়তে বাধ্য হন।
পার্শ্ববর্তী কুড়িগ্রাম জেলার বাসিন্দা এই কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর সাদুল্লাপুর উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে সরকারি খাস জমি, নামজারি, মিসকেস ও বিভিন্ন মামলার তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে এবং সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে উগ্র আচরণ ও হয়রানির অসংখ্য অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে সাদুল্লাপুর, জয়েনপুর ও জামুডাঙ্গা মৌজায় সরকারি ১ নম্বর খতিয়ান, ১/১ খতিয়ান এবং ‘ক’ ও ‘খ’ তফসিলভুক্ত সরকারের অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালীন তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার সঙ্গে জসিম উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। জসিম উদ্দিন ও তৎকালীন ইউএনও কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম মিলেমিশে কয়েকটি হাট-বাজার ইজারা ও খাদ্য ডিলার নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে একচেটিয়া প্রভাব খাটান, যা স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তাদের এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের মে মাসে এনসিপির স্থানীয় নেতারাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ফ্যাসিস্ট নেতাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা’র সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছিলেন। এসব কাণ্ডে স্থানীয় খাস জমি রক্ষা কমিটি ও সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তার অপসারণ ও শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছিল।
অন্যদিকে, গত ১৮ জুন সরকারের অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তি নামে অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক জিল্লুর রহমান পলাশ ও হেদায়েতুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হেনস্তার অভিযোগে আলোচনায় আসেন জসিম উদ্দিন। সাংবাদিকদের ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে তাদের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। একইসঙ্গে আঙুল উঁচিয়ে অফিস কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। ঘটনার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে তিনি দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচিত হন এবং ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’-তে পরিণত হন।
ঘটনাটি নিয়ে সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে বিভাগীয় পর্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ২১ জুন গাইবান্ধা সার্কিট হাউসে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে তদন্ত কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয় এবং এর পরেই ২৪ জুন তার দ্বিতীয় বদলির আদেশ জারি করা হয়। এরপর থেকেই ভুক্তভোগী সেবাগ্রহীতারা ভূমি অফিসে গিয়ে জসিম উদ্দিনের কাছে হয়রানি ও ভোগান্তির নানা অভিযোগ তুলে ধরেন।
সর্বশেষ ফ্যামিলি কার্ড শুমারি কর্মী নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের তীরও ওঠে এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ নিয়োগপ্রত্যাশী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একাংশ বিক্ষোভ করেন এবং এসিল্যান্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবি জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই জায়গায় দায়িত্ব পালনের কারণে কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও কথিত সাংবাদিকদের একটি অংশের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল এবং এই যোগাযোগকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে উঠেছিল।
এ ছাড়া স্থানীয়দের দাবি, জসিম উদ্দিনের আত্মীয়-স্বজনরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায়, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও তিনি সেই উচ্চপর্যায়ের তদবির ও লবিং খাটিয়ে সাদুল্লাপুরে বহাল তবিয়তে রয়ে যান।
তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, কুড়িগ্রাম জেলায় বাড়ি হওয়ায় তিনি প্রতি সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার কখনও নিজে, আবার কখনও স্ত্রীসহ পরিবারের লোকজনকে নিয়ে সরকারি গাড়িতে করে যাতায়াত করতেন। গাড়িচালক লাভলু মিয়া সরকারি বরাদ্দের জ্বালানি পুড়িয়ে এই ব্যক্তিগত প্রমোদভ্রমণ চালাতেন। সাধারণত এই গাড়িটি সাদুল্লাপুর থেকে লক্ষ্মীপুর হয়ে মাওলানা ভাসানী সেতু এলাকায় যাতায়াত করলেও গত সপ্তাহে গাড়িটি রুট পরিবর্তন করে সদরের দাড়িয়াপুর হয়ে সেতু এলাকায় যায়।
সস্প্রতি স্থানীয় কয়েকজন সরকারি গাড়ির এই অবৈধ ব্যবহার দেখে গাড়িটি আটকে দেওয়ার প্রস্তুতি নিতেই চালক লাভলু টের পেয়ে দ্রুত সটকে পড়েন। তবে স্থানীয়দের মোবাইলে সরকারি গাড়িটির অবস্থান ও সটকে পড়ার ভিডিও ধারণ করা আছে। শুধু তাই নয়, অভিযান চালিয়ে জব্দ করা ড্রেজার মেশিনের মালামাল রাতের আধারে বিক্রি করে দেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনার অভিযোগও রয়েছে।
বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবস পার করে শুক্রবার বিতর্কিত এই কর্মকর্তার কর্মস্থল ত্যাগ করায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দা ও ভূমিসেবা প্রত্যাশীরা। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, তিন দফায় জসিম উদ্দিনের বদলির পরেও তিনি কার ইশারায় ও কোন অদৃশ্য খুঁটির জোরে সাদুল্লাপুরে বহাল ছিলেন তা তদন্ত করে বের করা হোক। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, খাস জমি ও অর্পিত সম্পত্তি আত্মসাৎ, সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং জব্দ করা ড্রেজারের মালামাল চুরির ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।









