রাজধানীর বিভিন্ন সুপার শপ কিংবা গলির মুদি দোকান, প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায় হাতে ভাজা মুড়ি। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মেশিনে ভাজা মুড়ির পাশাপাশি স্বাদে অনন্য এই মুড়ির চাহিদাও ব্যাপক। এত হাতে ভাজা মুড়ি আসে কোথা থেকে? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকায় হাতে ভাজা মুড়ির বড় একটি অংশ দিনের পর দিন সরবরাহ করে আসছে কুমিল্লার একটি গ্রাম।
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রাম। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘মুড়ির গ্রাম’ নামে। প্রায় ছয় দশক ধরে গ্রামটির মানুষ হাতে মুড়ি ভেজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করছেন। তবে সময়ের সঙ্গে কমেছে মুড়ি ভাজার উনুন ও কারিগরের সংখ্যা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সে অনুযায়ী বাড়েনি মুড়ির দাম। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।
সূর্যের ছোপ ছোপ আলো পড়ছে গাছের ফাঁক দিয়ে। চারদিকে ভোরের পাখির কিচিরমিচির। এর সঙ্গে কুমিল্লা-চাঁদপুর মহাসড়কের পাশের গ্রামটি থেকে ভেসে আসছে উনুনের শব্দ। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে হাতে ভাজা মুড়ির গন্ধ। বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে নারীদের ব্যস্ততা। একসঙ্গে জ্বলছে পাঁচ চোখের উনুন। কেউ কাঠ দিচ্ছেন, কেউ গরম করছেন বালু। কেউ সেই বালুর মধ্যে চাল ঢেলে নেড়েচেড়ে মুড়ি ভাজছেন। আবার কেউ বালু থেকে আলাদা করছেন মুড়ি।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় দশক আগে গ্রামটিতে হাতে মুড়ি ভাজার কাজ শুরু হয়। একসময় কয়েকশ পরিবার এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কুমিল্লার পাশাপাশি ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যেত লক্ষ্মীপুরের হাতে ভাজা মুড়ি। বর্তমানে গ্রামটিতে মাত্র ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার এ কাজের সঙ্গে যুক্ত।
যেভাবে তৈরি হয় হাতে ভাজা মুড়ি
সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের অনেক বাড়ির উঠোনেই রয়েছে মুড়ি ভাজার চুলা। সেখানে কাজ করছিলেন জাহানারা বেগম। প্রায় নয় বছর ধরে মুড়ি ভাজার কাজ করছেন তিনি। এই আয় দিয়েই ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনাসহ সংসারের নানা খরচ চালিয়েছেন।
জাহানারা জানান, মুড়ি ভাজার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা চাল কিনে আনা হয়। প্রথমে চাল পরিষ্কার করে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। পরে শুকিয়ে ঝরঝরে করা হয়। এরপর আগে থেকে পাতিলে গরম করে রাখা বালুর মধ্যে চাল ঢেলে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই চাল ফুটে মুড়িতে রূপ নেয়। পরে বালু ও মুড়ি ছিদ্রযুক্ত বিশেষ মাটির পাত্রে ঢেলে আলাদা করা হয়। সবশেষে বস্তায় ভরে তা পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
জাহানারার কাজের সঙ্গী রাখি পাল বলেন, ‘নারীরা মূলত চুলার পাশে বসে মুড়ি ভাজার কাজ করেন। বাড়ির পুরুষরা পরে চালনি দিয়ে মুড়ি পরিষ্কার, প্যাকেটজাত ও বাজারজাত করেন। অনেক পরিবার এখনও কাঠ ও তুষের আগুন ব্যবহার করে মুড়ি ভাজেন।’
স্থানীয়দের দাবি, এই পদ্ধতিতে তৈরি মুড়ির স্বাদ ও ঘ্রাণ আলাদা।
দিনে ৬০-৭০ মণ উৎপাদন
মুড়ি উৎপাদনকারী দুর্গাচরণ পাল জানান, একসময় শতাধিক পরিবার মিলেও মুড়ির চাহিদা পূরণ করতে পারত না। এখন পরিবারগুলোর উৎপাদন মিলিয়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ মণ মুড়ি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, রমজান ও পূজার সময় মুড়ির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। রমজানের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে দিন-রাত কাজ করেন তাঁরা। প্রতি কেজি মুড়ির দাম ১২০ থেকে ১৪০ টাকা। পরে খুচরা বাজারে তা ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
নারীদের কর্মসংস্থানের ভরসা
লক্ষ্মীপুরের মুড়ি শিল্পে শতাধিক নারী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। কেউ চাল প্রস্তুত করেন, কেউ মুড়ি ভাজেন, আবার কেউ প্যাকেটজাত ও বাজারজাতকরণের কাজ করেন।
মুড়ি ভেজে আয় করেন জেসমিন বেগম। তিনি জানান, স্বামীর আয়ের পাশাপাশি প্রতিদিন মুড়ি ভেজে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পান। সংসারের খরচে এই অর্থ সহায়তা করে।
জেসমিন বলেন, ‘সংসারের কাজ সামলে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা মুড়ি ভেজে আয় করি। এই কাজই অনেক নারীর সংসার চালানোর প্রধান ভরসা। এতে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতাও এসেছে আমার।’
স্থানীয়দের মতে, গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানে এই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে স্বল্পশিক্ষিত নারীদের জন্য এটি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে আগের তুলনায় মুড়ির উৎপাদন, চাহিদা ও কাজ কমেছে। শ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক কম হওয়ায় অনেকে পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
বন্ধ হয়ে গেছে অনেক উনুন
সম্প্রতি গ্রামটি ঘুরে দেখা যায়, অনেক বাড়ির মুড়ি ভাজার চুলা এখন বন্ধ। কোথাও কোথাও চুলা ঘরবাড়ির নিচে পড়ে আছে। অনেক পুরুষ মুড়ির ব্যবসা ছেড়ে প্রবাসে গেছেন, কেউ করছেন দিনমজুরের কাজ। ফলে একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার ঐতিহ্যটি ধরে রেখেছে।
দুর্গাচরণ পাল বলেন, ‘জ্বালানি, চাল ও শ্রমিকের মজুরি বাড়লেও সে অনুযায়ী মুড়ির দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। এতে লাভ কমে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আধুনিক কারখানায় তৈরি প্যাকেটজাত মুড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ হচ্ছে। সব মিলিয়ে ব্যবসা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে অনেকে দীর্ঘদিনের ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।’
শ্যামল চন্দ্র পাল জানান, ছয় বছর আগে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে চলে যান। এক মাস আগে দেশে ফিরেছেন। তাঁর বাবা ও দাদা এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু লোকসানের কারণে তাঁরা মুড়ি উৎপাদন বন্ধ করে দেন। মুড়ি বিক্রি করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।
টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তার দাবি
লক্ষ্মীপুর গ্রামের ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা জানান, একসময় দীর্ঘ লাইন দিয়েও এখানকার হাতে ভাজা মুড়ি পাওয়া কঠিন ছিল। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। শ্রমের যথাযথ মূল্য না পাওয়ায় অনেকে এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল জলিল বলেন, ‘এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। তারা সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, গ্যাস ও জ্বালানিতে ভর্তুকি এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা পেলে টিকে যেতে পারে এই হাতে ভাজা মুড়ির গ্রাম।’
হাতে ভাজা মুড়ির এই শিল্প বাঁচাতে সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন কুমিল্লা বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসীর মামুন। তিনি বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলো সংরক্ষণ ও প্রসারে সরকার কাজ করছে। হাতে ভাজা মুড়ি শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই খাতে ব্যয় করতে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া যেতে পারে। আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি দেখব। তবে ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এলে আমাদের কাজটি সহজ হবে। আমরা চাই ঐতিহ্যবাহী এই পেশা টিকে থাকুক।’
ছয় দশক ধরে লক্ষ্মীপুরের চুলায় জ্বলছে ঐতিহ্যের আগুন। সেই আগুনে ভাজা মুড়ি আজও স্বাদ ও ঘ্রাণে আলাদা। কিন্তু বাড়তি উৎপাদন খরচ, কম লাভ, বাজার প্রতিযোগিতা আর পেশা বদলের কারণে ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে অনেক উনুন। স্থানীয়দের দাবি ও সরকারি সহযোগিতার আশ্বাস বাস্তবায়িত হলে হয়তো আবারও চুলায় আগুন জ্বলবে, আর লক্ষ্মীপুরের ‘মুড়ির গ্রাম’ ফিরে পাবে তার হারানো জৌলুস।