চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের (বর্তমানে এসআরবি) এক কর্মকর্তা হত্যা মামলার আসামি ও আলীনগরে ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিনের নামে বিভিন্ন পরিমাণের ৬৫টি জমির বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) এসব দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন তিনি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আজ বিকালে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হাবীবের বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করেছে মন্ত্রণালয়।
গত সোমবার রায়হান হাবীবসহ দেশের ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে একযোগে বদলি করা হয়। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের বৃহস্পতিবারের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে হাবীবকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ মার্চ প্রথমবারের মতো সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেন। এর আগে বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়নি। বরং অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
অভিযানের পর সন্ত্রাসীরা গা ঢাকা দেয়। পরে জঙ্গল সলিমপুরের এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ে র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে পৃথক দুটি চৌকি স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে সরকার।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এগোলে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত দিকে একটি সড়ক পাহাড়ের ভেতরে চলে গেছে। সেই পথেই জঙ্গল সলিমপুরের শুরু। এলাকাটি মূলত জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর—এই দুই অংশে বিভক্ত।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। আলীনগর দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইয়াসিন ও তার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেখানে পুলিশের অভিযানের পর ইয়াসিন ও তার সহযোগীরা পালিয়ে যায়।
সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির বিক্রয় দলিলের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন। পরে এসব জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বিক্রির দলিল ইস্যু করেন সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব।
একদিনে এতগুলো দলিল রেজিস্ট্রি করার বিষয়ে জানতে চাইলে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব বলেন, সীতাকুণ্ডের ভূমি অফিসের কাগজপত্র অনুযায়ী, এসব জমি ইয়াসিনের নামে নামজারি করা আছে। ইয়াসিন খাজনাও দিয়েছেন। কাগজপত্র ও দলিলসহ এসব জমির জন্য আবেদন জমা দেন আইনজীবী নাজিম উদ্দিন। কাগজপত্র ঠিক থাকায় দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
জঙ্গল সলিমপুরের জমি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও প্রশাসনের তৎপরতার পরও কীভাবে দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করা হলো, জানতে চাইলে রায়হান হাবীব বলেন, আমরা কাগজপত্র দেখি। এছাড়া জঙ্গল সলিমপুরের জমি নিয়ে আমাদের বিশেষ কোনও নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আইন অনুযায়ী সব প্রক্রিয়া মেনেই দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ডিসি জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বিষয়টি আমরা আজ বিকালে শুনেছি। পরে মন্ত্রণালয়কে তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। সীতাকুণ্ডের ইউএনও হাবীবকে ডেকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইয়াসিন নিজে তার কাছে আসেননি। বিধিমালা ও আইন অনুযায়ী, তার কাছে কাগজপত্র নিয়ে আসায় দলিলগুলো রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, লিংক রোডের আশপাশে প্রতি শতক জমি ৯ -১০ লাখ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে। সেই হিসাবে, সেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার ভূসম্পদ রয়েছে। এছাড়া জঙ্গল সলিমপুরে গাছসহ বিভিন্ন সরকারি সম্পদ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীরা এসব সম্পদ বিভিন্নভাবে দখল করে রেখেছে। সরকারি খাসজমির পাশাপাশি সেখানে কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও রয়েছে।
গত ১৯ জানুয়ারি এক আসামিকে গ্রেফতারে অভিযান চালাতে কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করে র্যাবের একটি দল। পরে মাইকিং করে ইয়াসিন বাহিনী ও স্থানীয়দের একটি অংশ র্যাব কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। হামলায় আরও তিনজন গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় ইয়াসিনসহ তার বাহিনীর অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা হয়েছে। তবে এখনও তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
৩২০ জন অপহরণের শিকার, বাহারছড়া কি আরেক ‘জঙ্গল সলিমপুর’