চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পের পানির ট্যাংকের পানি পান করে তিন পুলিশ সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর খাবার পানির পাইপলাইনে সুপরিকল্পিতভাবে কীটনাশক বা বিষ প্রয়োগের এ ঘটনায় অভিযানে নেমেছে পুলিশ।
রবিবার (২৬ জুলাই) বিকাল থেকে শুরু হয় অভিযান। এর আগে সকালে বিষ প্রয়োগের ঘটনা ঘটে। পরে ট্যাংকের পানির নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। বাকি পানি ফেলে ট্যাংক পরিষ্কার করা হয়।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহিনুল ইসলাম বলেন, ‘সকালে ক্যাম্পের তিন সদস্য গ্লাসে পানি ঢালার সময় তাতে সাদা ফেনা দেখতে পান। বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে তারা কিছু পানি পান করেন। পরে পানিতে একধরনের বিষাক্ত গন্ধ অনুভব করেন। এর কিছুক্ষণ পর তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন।’
ওসি বলেন, ‘ক্যাম্পের পানীয় জলের সরবরাহ পার্শ্ববর্তী একটি বাড়ি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পানির পাইপলাইনে কোনও বিষাক্ত পদার্থ প্রবেশ করেছে। তবে সেটি কীভাবে বা কার মাধ্যমে ঘটেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পর পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পুরো ট্যাংকের পানি ফেলে দিয়ে সেটি পরিষ্কার করা হয়েছে। অসুস্থ পুলিশ সদস্যদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত।’
এ ঘটনার খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, যে ঘরটির ভেতর ডিপ মোটর বসানো রয়েছে, সেখানে সরাসরি প্রবেশ করতে না পেরে দুর্বৃত্তরা পাইপলাইন ও সংযোগস্থলের গোড়া থেকে কেটে সেখানে সরাসরি রাসায়নিক কীটনাশক ঢেলে দেয়। ক্যাম্পের পাশাপাশি স্থানীয় স্কুলের কোমলমতি শিশুরাও এই পাইপলাইনের পানি পান করতো। ফলে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারতো বলে গভীর আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেন, যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পের পানির ট্যাংকে বিষ প্রয়োগের জড়িতদের ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে। যৌথ বাহিনীর ওই ক্যাম্পে র্যাব, বিজিবি ও পুলিশ মিলিয়ে প্রায় তিনশ সদস্য রয়েছেন। পাশের ডিপটিউবওয়েল থেকে তাদের পানি সরবরাহ করা হয়। দুর্বৃত্তরা ডিপটিউবওয়েলের সংযোগস্থলে বিষ বা বিষজাতীয় কিছু পুশ করে। অপারেটর সকালে পানি ও ট্যাংক চেক করতে গিয়ে দুর্গন্ধ পেয়ে সবাইকে সতর্ক করেন। এর মধ্যেই হাত-মুখ ধোয়ার পর তিন জন সদস্য অসুস্থ হয়ে যান।
তিনি আরও বলেন, রাস্তা কেটে দেওয়া বা ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো এসব ঘটনা পুরোপুরি অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম। দেশের ও সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টে নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে। বিকাল থেকে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে আলীনগরকেন্দ্রিক চিহ্নিত অপরাধীরাই এ ঘটনায় জড়িত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে গিয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক বলেন, আমাদের নিজস্ব ডিপ টিউবওয়েল ও পাম্পের পাইপলাইনটি নষ্ট করতে এবং মানুষ খুন করার কুমানসিকতা থেকে এই কীটনাশক দেওয়া হয়েছে। স্কুলপড়ুয়া শিশুরাও এই পানি পান করতো। অপরাধীদের এই অমানবিক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের আস্তানা হিসেবে পরিচিত সীতকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের যৌথ অভিযানে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়েও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি তারা; বরং অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
গত ২৫ মে জঙ্গল সলিমপুরে আলীনগর এলাকায় অবস্থিত যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে গুলি বর্ষণসহ হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় ভেকু দিয়ে একটি নির্মাণাধীন ক্যাম্প ভেঙে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ২৪২ জনের নাম উল্লেখসহ ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করা হয়। তবে এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন মামলার প্রধান আসামি ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান ইয়াছিন।









