রাঙামাটির সাজেকে টানা ১৪ দিন ধরে অবরোধ চলছে। বুধবারও সকাল থেকে সাজেক সড়কে কোনও ধরনের যান চলাচল করেনি। এ অবরোধে সাজেক এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া ওই এলাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন জুমচাষিরা।
শুধু তা–ই নয়, যান চলাচল না করায় ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন পর্যটকদের পরিবহনে ব্যবহৃত কয়েক শ গাড়ির চালক ও সহকারী। ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেক গাড়ির মালিক।
এর মধ্যে সাজেকে টানা অবরোধের প্রতিবাদে ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি। বুধবার ও বৃহস্পতিবার (৪ ও ৫ নভেম্বর) এ কর্মসূচি পালন করা হবে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সংগঠনটির সদস্যসচিব বিন্দু লাল চাকমা স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
এর মধ্য দিয়ে সাজেকে সংকট নিরসনে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ ঝুলে গেছে। পাঁচ দফা দাবির চারটিতে সমঝোতার অগ্রগতি হলেও মূল বিরোধের জায়গায় সিদ্ধান্ত না আসায় প্রত্যাহার হয়নি অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ। এর মধ্যে চতুর্থ দফায় অবরোধ কর্মসূচি শুরু হওয়ায় সাজেকের পর্যটন খাত, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। যদিও উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পরিবহনের ওপর শিথিলতার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারী সংগঠন দুটির নেতারা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তাদের দুই সংগঠনের যৌথসভায় সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে তারা জানান, উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহন ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী বহনকারী যান আওতামুক্ত থাকবে। এর আগে চলমান সড়ক অবরোধের সময় যেসব যানবাহন আওতামুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, তার সঙ্গে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের পরিবহণ ও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহনকারী যানবাহনও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর আগে থেকে জরুরি প্রয়োজনে রোগী অ্যাম্বুলেন্স, বিদ্যুৎ সরবরাহ গাড়ি, ধর্মীয় ও বিবাহ কাজে ব্যবহৃত গাড়ি এবং সাংবাদিকদের গাড়িসহ জরুরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বিশেষ শিথিলতা রয়েছে।
সাজেকের পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে কৃষিপণ্যের ব্যবসায়ী ও কৃষকদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তারা জানান। তবে সাজেকবাসীর পাঁচ দফা ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে ১ নভেম্বর একদিন শিথিলের পর সোমবার (২ নভেম্বর) থেকে নতুন করে অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতাকর্মীরা। মঙ্গলবারও সাজেক পর্যটন সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় যানবাহন চলাচল কার্যত বন্ধ ছিল।
গত ২৬ অক্টোবর উজোবাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি দলের বৈঠকে পাঁচ দফা দাবির চারটিতে সমঝোতার কথা জানানো হয়। তবে সাজেক এলাকা থেকে জেএসএস সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে মতপার্থক্য থাকায় আলোচনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। পরবর্তী সংলাপের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো পর্যন্ত নতুন বৈঠকের কার্যকর উদ্যোগের খবর পাওয়া যায়নি। আন্দোলনকারীদের দাবি, সব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানান, নতুন করে বৈঠকের বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। এছাড়া অবরোধের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় সাজেকভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
এর আগে ১ নভেম্বর স্থানীয় বাসিন্দাদের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে ১২ ঘণ্টার জন্য অবরোধ শিথিল ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা; কিন্তু একই দিন পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির পালটা অবরোধ এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল করতে পারেনি। ফলে অবরোধ শিথিলের উদ্যোগও জনদুর্ভোগ কমাতে পারেনি বলে জানান স্থানীয় লোকজন।
সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা বলেন, সাজেকের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে সংকটের প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। পর্যটক না থাকায় রিসোর্ট-কটেজ, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, স্থানীয় দোকানপাট ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অবরোধের কারণে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
তিনি জানান, সাজেকে ১১৬টির বেশি রিসোর্ট, ১৪টি রেস্তোরাঁ ও শতাধিক ছোট-বড় দোকান রয়েছে। টানা পর্যটকশূন্যতার কারণে ব্যবসায়ী, কটেজ মালিক ও কর্মচারীরা পুঁজি হারিয়ে ভীষণ কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে বাঘাইছড়ি উপজেলা সদর ও খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর সংকট এবং জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতের অনিশ্চয়তায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা বলেন, স্থানীয় লোকজনের ঘরে মজুত খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস শেষ হয়ে গেছে। রুইলুইপাড়ার পাঁচটি দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও শেষ। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে সংকট আরও কঠিন হয়ে দেখা দিতে পারে।
শিয়ালদাই মৌজার হেডম্যান ও ইউপি সদস্য জৌপেইথাং ত্রিপুরা জানান, সাজেকে পর্যটক না থাকায় এবং রাস্তাঘাট অবরোধ থাকায় স্থানীয় জুমচাষি ও ক্ষুদ্র বিক্রেতারা তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে তুলতে পারছেন না, যার ফলে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ছে। ওষুধসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, অবরোধের কারণে সড়কে বড় ধরনের যানবাহন চলাচল করছে না। মাঝে-মধ্যে কয়েকটি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় লোকজন ও পর্যটক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মূলত কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সাজেকের যোগাযোগব্যবস্থা। পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট চরমে পৌঁছেছে। কৃষিপণ্য পরিবহন বন্ধ থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরাও। এদিকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ সংকট নিরসনে এখনো আশানুরূপ কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে এই সংকটের সমাধান কে করবে, কিংবা কীভাবে হবে, তা কারও জানা নেই।
গত ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক সড়কে নতুন করে অবরোধ শুরু হয়। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। এটি এ দুই সংগঠনের তৃতীয় দফা অবরোধ। নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ কারণে পর্যটকেরা এলাকা ছেড়ে গেছেন। গত ১১ অক্টোবর থেকে টানা অবরোধের কারণে সাজেকে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর অবরোধ শিথিল করা হলেও ২২ অক্টোবর থেকে আবারও যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। দফায় দফায় অবরোধ ও শিথিলতার মধ্যেও পরিস্থিতির স্থায়ী কোনও সমাধান হয়নি। ফলে এখনও সবকিছু অচল অবস্থায় আছে।
অবরোধের কারণে বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য বাইরে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে একদিকে খাদ্যসংকট বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষকরা। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা বলেন, অবরোধের কারণে সাজেক সড়কে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়রা কৃষিপণ্য পরিবহন করতে পারছে না। এতে এখানকার মানুষের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ হতে সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এখনও আশানুরূপ সমাধান হয়নি। ফলে এই সংকট কবে কাটবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা বলেন, এলাকার বাসিন্দারা ঘরে মজুত থাকা খাবার দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। রুইলুই পাড়ার পাঁচটি দোকানে থাকা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও শেষের পথে। অবরোধ আরও দু-এক দিন চললে এলাকায় খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।
খাগড়াছড়ির যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা জানান, তাদের সমিতিতে তালিকাভুক্ত গাড়ি রয়েছে ২৫০টি। জিপ মালিক সমিতির গাড়ি রয়েছে ৫০০টির বেশি। এ ছাড়া মাহিন্দ্র, চাঁদের গাড়ি, সিএনজিসহ প্রায় দেড় হাজারের বেশি যানবাহন সাজেকে চলাচল করে। অবরোধে এসব যানবাহনের চালক ও সহকারীদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মালিক ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনায় তারাও কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়েছেন। সব মিলিয়ে জেলায় যানবাহন খাতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে।