গোপালঞ্জে শিশুদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরী গোপীনাথপুর হাই স্কুল সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪১৮ জন শিক্ষার্থীর প্রায় সবাইকে টাকা কম দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন।
অভিভাবকরা দাবি করেন, স্কুলে ২টি হাজিরা খাতা রয়েছে। একটি খাতায় শিক্ষার্থীদের হাজিরা দেখানো হয়। অন্য খাতায় কারসাজি করে গড় হাজির দেখানো হয়। পরে উপবৃত্তির টাকা তুলে শিক্ষার্থীদের কম দিয়ে বাকিটা আত্মসাৎ করা হয়। শিক্ষার্থীদের টাকা কম দিলেও কাগজে কলমে সব ঠিক রাখা হয়, যাতে তদন্ত হলে তাদের যাতে ধরতে না পারে বলে অভিভাবকরা অভিযোগ করেন।
এজন্য তারা স্কুল শিক্ষকসহ ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা উপবৃত্তি মনিটরিং অফিসারকে দায়ি করেন। তারা যোগসাযোসে উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ করছেন বলে অভিভাবকদের অভিযোগ রয়েছে।
অভিভাবক জবেদা বেগম বলেন, আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে ৫ম শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তারা নিয়মিত স্কুলে যায়। ক্লাস করে। আমার তিন ছেলে মেয়ের গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরে জুন পর্যন্ত ১ বছরে পাওনা হয়েছে ৩ হাজার ৬ শ’ টাকা। কিন্তু এক বছরে মাত্র ৬ শত টাকা দিয়েছে স্কুল কতৃপক্ষ।
টাকা কম দেওয়ার ব্যাপারে প্রধান শিক্ষককের কাছে জানতে চাইলে তিনি আমাদের বলেন, আপনার ছেলে মেয়েরা ঠিক মত স্কুলে আসে না। তাই টাকা কম পেয়েছে।
২য় শ্রেণীর শিক্ষার্থী মুরসালীন অভিযোগ করে বলে, আমি প্রতিদিন স্কুলে আসি। কিন্তু আমাকে ১ বছরে ১ হাজার ২ শ’ টাকার জায়গায় মাত্র ২ শ’ টাকা বৃত্তি দিয়েছে।
ওই স্কুলের শিশু শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবক এসমতারা ও হামিদা বেগম বলেন, আমরা নিয়মিত ছেলেদের স্কুলে পৌঁছে দেই। তারপরও স্যার-ম্যাডামরা বলেন, তোমার ছেলেরা ঠিকমত স্কুলে আসে না। আমাদের ছেলেদের মাত্র ২শ’ টাকা করে দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, স্কুলে ২টি হাজিরা খাতা রয়েছে। টাকা কম দেওয়ার উদ্দেশ্যে কৌশলে একটি হাজিরা খাতায় শিক্ষার্থীদের কম হাজিরা দেখানো হয়। মূল হাজিরার খাতা লুকিয়ে রাখা হয়। টাকা কম দেওয়ার ব্যপারে প্রতিবাদ করলে ছেলে-মেয়েদের টিসি দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকী দেন প্রধান শিক্ষক। সরকার স্কুলে উপস্থিতি বৃদ্ধি ও ঝড়েপরা রোধে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু টাকা লুটে খাওয়ার জন্য অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে অনুপস্থিত দেখান স্কুল কতৃপক্ষ।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুলতানা পারভিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিভাবকরা না বুঝেই আমার ওপর এ মিথ্যা অভিযোগ এনেছেন। স্কুলের হাজিরা খাতা দেখে যে সব শিক্ষার্থীর ৮৫% হাজিরা রয়েছে তাদের তালিকা তৈরি করে আমরা ব্যাংকে টাকার চাহিদা পত্র পাঠাই। ফেল করে কোনও শিক্ষার্থী ওই ক্লাসে থেকে গেলে সে কোনও বৃত্তি পাবে না। চাহিদাপত্র অনুযায়ী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসে শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের হাতে টাকা তুলে দেন। টাকা আমাদের হাতে দেওয়া হয় না। সুতরাং এখানে আমাদের টাকা আত্মসাতের কোনও সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে জানাতে চাইলে আমি কাউকে টিসি দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকিও দেইনি।
ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারি শিক্ষা অফিসার মো. আমজাদ হোসেন উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেন, শিক্ষক কোনও শিক্ষার্থীকে হাজির খাতায় অনুপস্থিত দেখাবে বলে আমার মনে হয় না। এখানে এক ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। আমার মনে হয় ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষকরা অভিভাবকদের নিয়ে এক সাথে বসে বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝালে তাদের ভুল ভেঙে যাবে।
জেলা উপবৃত্তি মনিটরিং অফিসার কামাল উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, বিষয়টি আমার জানানেই। আমি কোনও দিন ওই স্কুলে যাইনি। যোগসাযোসে টাকা আত্মসাতের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। শিশু শ্রেণিতে শিক্ষার্থী প্রতি মাসিক ৫০ টাকা করে ও অন্য শ্রেণিতে ১ শ’ টাকা করে দেওয়া হয়। কোনও মাসে শিক্ষার্থী ৮৫ ভাগের কম উপস্থিত থাকলে সে মাসে তাকে উপবৃত্তি দেওয়া হবে না। এই কারণে টাকা কম বেশি পেতে পারে। তবে এ ব্যাপারে ওই ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষা অফিসার ভালও বলতে পারবেন।
আরও পড়ুন: নিখোঁজ দুই যুবকের ফেরার অপেক্ষায় পরিবারের সদস্যরা
/জেবি/টিএন/আপ-এআর/







