দুর্নীতি, কম বাজেট ও নিম্নমানের কাজের জন্য বছরের শেষেই ধসে গেছে কিশোরগঞ্জের ইটনার বরিবাড়ি ইউনিয়নের শিমুলবাগ গ্রামের গ্রামরক্ষা দেয়াল। অথচ গত বছর গ্রামটি রক্ষায় বসানো হয় প্রতিরক্ষা দেয়াল। এতে গ্রামের লোকজন আবারও শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তাদের ভবিষ্যৎ ও মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে।
ভাঙনের কবলে পড়ে এক সময়ের বিশাল জনপদ আজ একচিলতে ছোট্ট গ্রাম। গত ৪০ বছরে ঘরবাড়ি হারিয়ে বহু পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও। যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, কেবল তারাই রয়ে গেছে এই গ্রামে।
গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য সাফিয়া আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, ‘সবার দাবি ছিল, গ্রাম বাঁচাতে প্রতিরক্ষা দেয়াল দেওয়া হোক। সেই দেয়াল হলো ঠিকই, কিন্তু তা কাজে লাগছে না গ্রামবাসীর। বছর না ঘুরতেই ধসে যাচ্ছে হিলিপ প্রকল্পের সেই গ্রাম রক্ষার দেয়াল।’
শিমুলবাগ গ্রামের তাজুল ইসলাম নামে এক বাসিন্দা বলেন,‘এই দেয়াল গেরামের চাইরানার কামও অইছে না। এই বছরের দেয়াল এই বছরেই ভাইঙ্গ্যা গ্যাছে। নতুন কইরা গ্রামও ভাঙতাছে। সরহারি (সরকারি) টেহা (টাকা) সবটাই জলে গেছে।’
ধসে পড়া প্রতিরক্ষা দেয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিমুলবাগ গ্রামের জসিম দাদ খান। তিনি বলেন, ‘গ্রামে প্রতিরক্ষা দেয়াল হচ্ছে এ কথা শুনে সবাই তাদের বাড়িঘর মেরামতের উদ্যোগ নেয়। কেউ ঋণ করে, কেউ গরু বিক্রি করে, কেউ খানিকটা জমি বিক্রি করে দেয়ালের কাছাকাছি জায়গায় মাটি ফেলে তাদের বাড়িঘর সরিয়ে নেন। কারণ গ্রামের পেছনে ধনু নদীর ভাঙন দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু লাখ লাখ খরচ করেও শান্তি আসেনি আমাদের। অসংখ্য জায়গায় দেয়াল ধসে পড়ায় আমরা দুর্ভাবনায় আছি।’
জানা গেছে, হাওর অঞ্চলের অবকাঠামো ও জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের (হিলিপ) আওতায় গত বছর ৬৫ লাখ টাকা খরচ করে গ্রাম প্রতিরক্ষা দেয়ালটি নির্মাণ করা হয়। এটি লম্বায় ছিল ৭০৫ মিটার। স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিইডি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে।
হিলিপ প্রকল্পের কিশোরগঞ্জ জেলা সমন্বয়কারী মো. নূরুল আমিন প্রতিরক্ষা দেয়ালটি ধসে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগটি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দেয়ালটি গ্রাম ঘেঁষে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু গ্রামবাসীর অনুরোধে দেয়ালটি অনেকটা হাওরের দিকে সরিয়ে আনা হয়। এখান দেয়ালের ভেতরে অর্থাৎ গ্রামের দিকে খালি জায়গায় প্রচুর মাটির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই পরিমাণ মাটির ব্যবস্থা স্থানীয়রা করতে পারেনি। ফলে হাওরের পানির চাপে দেয়ালটি ধসে গেছে।’
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দানেশ আকন্দ বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে প্রকল্পের কাজ দায়সারাভাবে শেষ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘লাখ টাকার মাটি ফেলেও যদি এ মাটিতে না হয়ে থাকে, তাহলে বলবো আমাদের আর ক্ষমতা নেই।’
কিশোরগঞ্জ স্থানীয় সরকার অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো.গোলাম মওলা বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে এ প্রকল্পের বাজেট ছিল কম। তবে ধসে যাওয়া অংশগুলো মেরামতযোগ্য। পানি কমে গেলে এগুলো মেরামত করে দেওয়া হবে। আর দেয়ালের ভেতর দিক দিয়ে আরও মাটি ফেলতে হবে। তবে মাটি ফেলা বাবদ কোনও বরাদ্দ নেই প্রকল্পে। আমরা গ্রামবাসীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবো। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এ দেয়াল টেকানো যাবে না।’
/এমডিপি/টিএন/








